Search

প্রকৃত বন্ধুর পরিচয়

প্রকৃত বন্ধু  তিনি যিনি দুঃসময়েই বন্ধু

প্রকৃত বন্ধু তিনি যিনি দুঃসময়েই বন্ধু

 

স্বামী ও স্ত্রী—এই দুজনকে নিয়েই কিন্তু সংসার এবং যাপিত জীবনের সবটুকু নয়। সংসার নামক নিউক্লিয়াসের ভরকেন্দ্রে এ দুজন অবশ্যই মুখ্য। তার পরও সংসারের গণ্ডি আরেকটু বড় করে দেখতে দোষ কী!
কোনো দম্পতির নতুন সংসারের যাত্রা যখন শুরু, তখন সেটি আপন অক্ষে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিভ্রমণ শুরু করলেও তাঁর পাশে গ্রহ, উপগ্রহও কম নয়। আত্মীয়স্বজন যেমন আছেন, তেমনি অতি অবশ্যই আছেন বন্ধুরা। বন্ধুও নানা রকম, কিছু আছেন অত্যুৎসাহী বন্ধু। তিলকে তাল করে বন্ধুকৃত্যের নামে নানা উসকানি ও ইন্ধনেও থাকেন কিছু লোক। আর আছেন সুবন্ধু; সজ্জন; সদা কল্যাণী হাত বাড়িয়ে পাশে। কীভাবে বন্ধু বা বান্ধবীর সংসার সুখের ঠিকানা হয়—সে জন্য তাঁরা নানা বুদ্ধি-পরামর্শ দিয়ে সুখে-দুঃখে সঙ্গী হন। বিপদে হাত বাড়ান। স্বামী-স্ত্রীর ভুল বোঝার মাঝে তাঁরা দেশলাইয়ের কাঠি হন না। বরং সমস্যা নিরসনে রাখেন উজ্জ্বল ভূমিকা।
স্বামী-স্ত্রীর মান-অভিমান, রাগবিরাগ থাকবে না; এমনটা হতে পারে না। সংসারধর্মে খুনসুটি হলো আবশ্যিক অনুষঙ্গ। অনেকে তো বলেই থাকেন, মান-অভিমান থাকলে সম্পর্কের মধুরতা বাড়ে। কিন্তু মিষ্টতা বাড়াতে গিয়ে সম্পর্কের যদি অবনতি ঘটে, তখন কী হবে? যেমন লেবু বেশি কচলালে তেতো হয়ে যায়। ক্ষুদ্র বিষয় নিয়ে হয়তো মনোমালিন্যের শুরু—সেটা আর ক্ষুদ্র থাকে না। অকারণেই বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়। আর তখনই তৃতীয় পক্ষের আনাগোনা শুরু হয়।
এই থার্ড পারসন সব সময় সিঙ্গুলার নাম্বার হয় না। সংসারে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এটা বহুবচন। কখনো আত্মীয়স্বজনও নাক গলান। অনিবার্যভাবে আসে বন্ধুদের ভূমিকার ব্যাপারটি। তাঁরা কি নিরপেক্ষ ‘তৃতীয় পক্ষ’ÿ থাকবেন কিংবা ধরি মাছ না ছুঁই পানির মতো ঝামেলা বাঁচিয়ে চলবেন? নাকি দুই পক্ষের অভিযোগ-পাল্টাপাল্টি শুনে আম্পায়ারিং বা রেফারিগিরি করবেন। তাঁরা কি দম্পতির সংসার ও দাম্পত্য যাতে অটুট থাকে, সে জন্য সর্বাত্মক ইতিবাচক উদ্যোগ নেবেন? বলাই তো হয় বিপদে বন্ধু চেনা যায়। ব্রিটিশ গীতিকার ও সুবক্তা কেলি অসবার্ন যেমনটা বলছেন, বন্ধু হচ্ছে সেই জন; যে তোমাকে ভালুকের জিম্মায় ফেলে পালাবে না; এমনকি তোমার জীবনসঙ্গী চলে গেলেও তাকে ফেরাতে তদবির করবে।
এক নবদম্পতি। হেসে-খেলে ভালোই সময় কাটছিল। তাহলে সমস্যা কী? মেয়েটির স্বামী বন্ধুদের নিয়ে বাসায় আড্ডা বসানোর জন্য ইদানীং তাগাদা দিচ্ছে। আর এতে রাজি না হলে বাইরে রিসোর্ট বা বিভিন্ন জায়গায় যেতে হবে বলে জোর করছে। মেয়েটির কথা হলো আমাদের সবেমাত্র বিয়ে হলো। চলো না কিছুদিন নিজেদের মতো করে সময় কাটাই। আত্মীয়স্বজন আছে, তাদেরও সময় দিই। বন্ধুদের নিয়েও যে অনুষ্ঠান হয়নি তা নয়। কিন্তু বরটি তাঁর বউয়ের কথা শুনতে রাজি নন।
স্বামী বললেন, এত দিন তো এই বন্ধুরাই তাকে সময় দিয়েছে। ওদের বাড়িতে কত গিয়েছি, খেয়েছি। এখন আমি যদি এড়িয়ে যাই, তবে ওদের মুখ দেখাই কী করে?
আরেক দম্পতি। প্রায় দুই যুগের সংসার। দুজনের সম্পর্ক তেমন ভালো নয়। এর মধ্যে স্ত্রীর পুরোনো প্রেমিকের আহ্বান। তাঁর কতিপয় বান্ধবী তাঁকে ওই প্রেমিকের সঙ্গে ডেটিংয়ের ব্যবস্থা করে দিলেন। স্বামী বেচারা না জানলেও উল্টো দিকে প্রেমিকের বউ ঘটনাটা জেনে যান। তিনি হাটে হাঁড়ি ভেঙে জানিয়ে দেন। স্বামীর কানেও খবর আসতে দেরি হয় না। তারপর যথারীতি গন্ডগোল; ঝগড়াবিবাদ। সংসার ভেঙে যাওয়ার উপক্রম। এঁদের কি বন্ধু বলা যায়, আপনি বলুন—আকুল প্রশ্ন ভুক্তভোগী পক্ষের। বেচারা কাঁদো কাঁদো হয়ে বলছিলেন, ওর এই চরিত্রের জন্য আমাকে সারা জীবন চোখকান বন্ধ করে থাকতে হয়েছে। কিন্তু আর কত দিন? অনেক দিন থেকেই এই রামলীলা চলছিল। চোরের দশ দিন আর গৃহস্থের এক দিন। শেষ পর্যন্ত ধরা পড়ল। আমি এখন কী করব?
ডেটিংয়ের ব্যবস্থা করে দেওয়ার আগে বান্ধবীরা কি একবারও ভাবল না যে এ কাজে সাহায্য করা উচিত কি না?

 

তৃতীয় পক্ষের কী স্বার্থ?
মানুষ যে যার রুচি ও মানসিকতা আনুযায়য়ী ভালো থাকে। তার নিজ দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিচার করে ভালো-মন্দ। বেশির ভাগ মানুষই পরস্পরের ভালো চায়। কিন্তু রাস্তায় যখন কোনো লোক মনের বেখেয়ালে ম্যানহোলের গর্তে পড়ে; মজা পায় না এমন লোকের সংখ্যা কত?
এমন মানুষ সংসারে বিরল নয়, ছিদ্রান্বেষণ বা অন্যের সমস্যায় নাক গলানোয় যাদের বড় আনন্দ! বন্ধুর সমস্যায় কেউ ব্যথিত হয়। আবার কারও মজা লোটার মওকা। সুযোগ-সময়মতো নাক গলানো যায়। বুদ্ধি-পরামর্শ দেওয়া যায়, মাতুব্বরি ফলানো যায়। কাজে লাগলে ভালো। নইলে কৈফিয়ত আছেই যে আপনার ভালোই তো চেয়েছিলাম। বন্ধুর সংসারের সমস্যা সুরাহা করে কারও পরমানন্দ; আবার ছলছুতায় নাক গলিয়ে; উল্টোপাল্টা বদ বুদ্ধি দিয়ে বন্ধুর সংসারে অশান্তি করে কারও বিকৃত সুখ।
মনোবিশ্লেষকদের কারও কারও মতে, নিজে সুখী হলে অন্যের সুখ ভালো লাগে। তখন সবাই সুখে থাকুক মনেপ্রাণে চায়। কিন্তু কেউ যখন চিতার আগুনে জ্বলে, তখন আশপাশের সবাইকে নিয়ে চিতায় উঠতে চান। সেই আলু পোড়া খাওয়ার গল্প।

 

তৃতীয় পক্ষকে কতখানি প্রশ্রয় দেবেন?
কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দিতে পারার তৃপ্তি খাবার পর ঢেকুর তোলার মতোই আরামদায়ক। এই নুনের ছিটা খাওয়ার সুযোগ কিন্তু আপনিই আপনার অজান্তেই অন্যের হাতে তুলে দেওয়ার ভুলটা করতে পারেন। ক্রাইসিস পিরিয়ডে অন্যকে বন্ধু মনে হলেও এখন ছুরি হয়ে ঢুকে ভবিষ্যতে ফাল হয়ে বেরোবে না, কে জানে? তাই ভেবেচিন্তে কাজ করা উচিত; করার পর ভেবে কোনো ফায়দা নেই।

 

কী করণীয়?
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মান-অভিমান, রাগবিরাগ যদি না-ই থাকে, তবে সংসারজীবন একটা নিরাবেগ রোবটের জীবন হয়ে যাবে।
দোষ-ত্রুটি নিয়েই মানুষের জীবন। মানুষ সামাজিক জীব। বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন—সবাইকে সঙ্গে নিয়েই চলতে হবে। কিন্তু নিজেদের সম্পর্কের মধ্যে তৃতীয় পক্ষের নাক ঢোকানো কোন পর্যন্ত মেনে নেবেন, তার সিদ্ধান্ত আপনাদেরই নিতে হবে। স্বামী-স্ত্রী হচ্ছে একটা লিগ্যাল ইউনিট। নিজেদের ত্যক্তবিরক্ত হওয়াটা কতখানি কোন মাত্রায় ওঠাবেন, সে ক্ষেত্রে বেখেয়াল ও বেওকুফ হলে চলবে না। মাত্রা ছাড়ানো কখনোই ঠিক নয়।
যে সমস্যা নিয়ে ঝড় উঠল, তা আসলেই কতখানি যৌক্তিক, কতখানি সমাধানযোগ্য, তা ভাবতে হবে। এ সমস্যা জিইয়ে রাখতে চান; তাতে কী লাভ! তার চেয়ে সমঝোতা ও সমাধানের পথ খুঁজুন। সদিচ্ছা রাখুন। অবশ্যই সব মনোমালিন্য মিটবে। নিজেরা নিজেদের সময় দিন। মাথা ঠান্ডা রেখে একে অপরের ওপর ভরসা রেখে আলোচনা করুন। সিদ্ধান্ত নিন। বন্ধু-স্বজনদের সঙ্গে শলাপরামর্শ অবশ্যই করতে পারেন। তবে সতর্ক থাকতে হবে। অন্যকে ঢুকতে দিলে সে তার মতো করে মতামত দিতে চেষ্টা করবে। কাদা-মাখামাখি, লোক
হাসানোর পথ খুঁজে নেবেন, নাকি আপসে সিদ্ধান্ত নেবেন—ঠিক করুন।
বন্ধু যদি সত্যিই বন্ধু হয়, তবে সে আপনার সমস্যা বুঝবে। বন্ধু যদি সত্যিকারের বন্ধু হয়, তার পরামর্শ হবে সংসারের মঙ্গলের জন্য। তার দৃষ্টিভঙ্গি হবে ইতিবাচক ও সদর্থক। বিশ্বসাহিত্যের মহৎ গল্পকার ও হেনরি বলেছেন, কারও জীবনে কল্যাণকামী বন্ধু না থাকলে সেটা দুর্ঘটনা।
আবার বন্ধু প্রশ্নে আলবার্তো কামু হুঁশিয়ার করতেও ভোলেননি—যে তোমার সামনে চলছে, সব সময় তাকে অনুসরণ কোরো না। কেননা শেষ বিচারে দায় তোমাকেই নিতে হবে; সিদ্ধান্তটি মঙ্গল না অমঙ্গলের ছিল।
কল্যাণী বন্ধু পাওয়া সৌভাগ্যের। আবার অমঙ্গলের বন্ধুকে চিনে নিতে না পারলে দুর্ভাগ্যেরও শেষ নেই।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, মনোরোগবিদ্যা বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

সৌজন্যে প্রথম আলো

comments