Search

বিল গেটস :: হিরো থেকে জিরো

বিল গেটসের তৈরি যে ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার থামিয়ে দিয়েছিল নেটস্কেপের যাত্রা তা আবারও ফায়ার ফক্সের রূপ ধরে উঠে এসে শেষ হাসি হাসছে।

বিল গেটস  হিরো থেকে জিরো

বিল গেটস হিরো থেকে জিরো

নতুন খবর হল, মাইক্রোসফট স্পার্টান কোড নাম দিয়ে নতুন একটি ব্রাউজার তৈরি করছে আর ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার ব্রাউজারকে অবসরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাতে কী? ভারী আর অনেকটাই অকেজো হয়ে ওঠা আইকনিক এই ব্রাউজারের এমন পরিণতি হয়তো অধিকাংশ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর কাছে প্রত্যাশিতই ছিল। কিন্তু যাঁরা ইন্টারনেটের প্রথম যুগের মানুষ তাঁদের কাছে মজাদার একটা অধ্যায়ের করুণ সমাপ্তির মতোই বিষয় এটা। ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার ব্র্যান্ডটির বিদায়ের মধ্যে দিয়ে কম্পিউটারের আধুনিক যুগের ইতিহাসের একটা মজার অধ্যায়ের ইতি টানা হয়ে গেল।
চলুন একটু পেছনে ফিরে ব্রাউজারের ইতিহাস দেখে আসি। ১৯৯৩ সাল, ইন্টারনেটের বয়স বড়জোর এক দশক হবে। ইন্টারনেটের এই প্রথম দশকটি কম্পিউটার বিজ্ঞানী, বিশেষজ্ঞদের বাইরে তেমন করে আর কারও ভালো জানা ছিল না। এর মাত্র বছর দু-এক আগে কম্পিউটার বিজ্ঞানী টিম বার্নার্স-লি ইন্টারনেটের জন্য উদ্ভাবন করেন ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব (ডব্লিউডব্লিউডব্লিউ)। কিন্তু সে সময় এটি কারও চোখেই পড়েনি। ১৯৯৩ সালের বসন্তে এসে মার্ক অ্যান্ড্রেসেন ও এরিক বিনা বিশ্বের প্রথম গ্রাফিকাল ব্রাউজার ‘মোজাইক’ উন্মুক্ত করেন। এর পর হঠাৎ করেই যেন ইন্টারনেট নিয়ে বিশ্বজুড়ে তোলপাড় উঠতে শুরু করে। ইন্টারনেট কী এবং এ দিয়ে কী করা যেতে পারে তা যেন বিশ্ববাসী হঠাৎই বুঝতে পারে। কিন্তু এই শোরগোলের মাঝেও বিপরীত স্রোতে চলছিল একটি প্রতিষ্ঠান যার নাম-মাইক্রোসফট। দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ তথ্য।
মাইক্রোসফটের ক্ষেত্রে তখন অদ্ভুত যে বিষয়টি দেখা যায় তা হচ্ছে, বিশ্বে কম্পিউটিংয়ের ক্ষেত্রে নেতৃস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে উঠে এলেও ইন্টারনেটের এই ছড়িয়ে পড়ার বা ইন্টারনেটের উপযোগিতার বিষয়টি তারা তখন বুঝতেই পারেনি! মাইক্রোসফটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসের আত্মজীবনীর লেখক জেমস ওয়ালেসের দাবি, ১৯৯৩ সালের আগ পর্যন্ত মাইক্রোসফটের কাছে কোনো ইন্টারনেট সার্ভারই ছিল না। কারণ এ ধরনের কোনো সার্ভারের প্রয়োজনই বোধ করেনি প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু প্রথম এ ধরনের সার্ভারের প্রয়োজন বোধ করেন বিল গেটসের প্রধান সহকারী স্টিভ বলমার। তাও এক রকম বাধ্য হয়ে তিনি একটি সার্ভার বসানোর কথা চিন্তা করেন।

 

ওই সময় একটি ব্যবসায়িক ভ্রমণে গিয়ে বলমার দেখেন মাইক্রোসফটের অধিকাংশ বড় বড় করপোরেট গ্রাহকই তাঁর কাছে উইন্ডোজ নিয়ে অভিযোগ জানাচ্ছেন। অভিযোগটি ছিল, উইন্ডোজে কোনো ‘টিসিপি/আইপি স্টাক’ (ইন্টারনেটে যুক্ত হওয়ার পদ্ধতি) নেই। বলমার ওই সময় পর্যন্ত টিসিপি/আইপি সম্পর্কে কোনো কিছুই শোনেননি। পরে সিয়াটলে ফিরে এসেই তিনি অধীনস্থদের বকাঝকা শুরু করলেন। বলমার বললেন, ‘আমি নিজেই জানি না টিসিপি/আইপি কী জিনিস, আর এটা কী তা আমি জানতেও চাই না। কিন্তু আমার গ্রাহকেরা এটার জন্য চেঁচামেচি শুরু করেছেন। আমাকে এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দাও।’ কাজে লেগে পড়লেন মাইক্রোসফটের প্রকৌশলীরা। কিন্তু তাতেও কী বলমারের যন্ত্রণা কমল?

 

তাঁরা যখন টিসিপি/আইপি স্টাক তৈরি করলেন তখন মাইক্রোসফটের জ্বালা যেন আরও বেড়েই চলল। কারণ অ্যান্ড্রেসেন ও তাঁর সহকর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে ‘নেটস্কেপ’ নামের নতুন একটি ব্রাউজার তৈরি করে তা নেটস্কেপ নেভিগেটর নামে ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করলেন। তাঁদের এই সফটওয়্যারটি দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল এবং নেটস্কেপের প্রতিষ্ঠাতার ভাবতে শুরু করলেন যে, কম্পিউটার ব্যবহারকারীদের জন্য ব্রাউজারই একমাত্র দরকারি সফটওয়্যার আর কম্পিউটারের অপারেটিং সিস্টেম কেবল ব্রাউজারের লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম!
অবশ্য, ততদিনে টনক নড়তে শুরু করেছে মাইক্রোসফটের। নেটস্কেপের সাফল্য তাদের চোখ খুলে দিল। যা হোক, মাইক্রোসফট তো অপারেটিং সিস্টেম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। ১৯৯৫ সালের ২৬ মে বিল গেটস তাঁর কর্মীদের জন্য অভ্যন্তরীণভাবে একটি মেমো প্রকাশ করলেন। এর নাম ছিল দ্য ইন্টারনাল টাইডাল ওয়েভ। এই মেমোতে গেটস তাঁর অধীনস্থদের নির্দেশ দিলেন যা কিছু লাগে, যত সম্পদ খরচ হয় হোক; সব ব্যবহার করে হলেও ওয়েব ব্রাউজার তৈরি করতে হবে এবং ব্রাউজারের বাজার দখল করতে হবে। ব্রাউজার তৈরি করে নেটস্কেপকে হঠাতে রীতিমতো যুদ্ধই ঘোষণা করলেন বিল গেটস। মাইক্রোসফটের প্রকৌশলীরা বেশ দ্রুতই তৈরি করে ফেললেন একটি ব্রাউজার আর এর নাম দিলেন ‘ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার’ (আইই)। নেটস্কেপের বাজার কেড়ে নিতে উইন্ডোজের সঙ্গে এই ব্রাউজারটিকে যুক্ত করে দেওয়া হল। এরপর মাইক্রোসফটের যত পিসি বিক্রি হতে শুরু করল সবগুলোতেই ডিফল্ট ব্রাউজার হিসেবে জায়গা করে নিল ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার।
মাইক্রোসফটের পরিকল্পনা সফল হল। নেটস্কেপকে ধ্বংস করে দিল এক্সপ্লোরার এবং তৈরি করল একক আধিপত্য। ২০০০ সাল নাগাদ ৯৫ শতাংশ বাজার দখল করে নিল এই ব্রাউজারটি। ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার নামটি তখন ইন্টারনেটের সমর্থক হয়ে উঠল। অর্থাৎ, কোনো সফটওয়্যার তৈরি করতে হলে তা ইন্টারনেট এক্সপ্লোরের কাজ করতে হবে এমনই শর্ত তৈরি হয়ে গেল। এক্সপ্লোরার ফ্র্যাঞ্চাইজির একচ্ছত্র আধিপত্য দেখতে শুরু করল বিশ্ব। কিন্তু এটিই মাইক্রোসফটের জন্য দ্বিমুখী তলোয়ার হয়ে গেল। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা ইন্টারনেট এক্সপ্লোরারকে ঘিরে তাদের প্রযুক্তি অবকাঠামো গড়তে শুরু করল। উদাহরণ হিসেবে এনএইচএসের কথা বলা যায়। তাদের পিসির জন্য সফটওয়্যার তৈরি করতে হলে তা শুধু ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার সমর্থন করলেই হবে না তা নির্দিষ্ট সংস্করণে চলতে হবে এ ধরনের শর্তও জুড়ে দেওয়া শুরু করল।

 

ব্রাউজারের বাজার দখল রাখার মাইক্রোসফটের বিশাল এই সফলতা তাদের বেশ কিছু বড় গ্রাহককে অকার্যকর ও অরক্ষিত সময়ের ফাঁদে ফেলে দিল। অর্থাৎ তারা আটকে গেল নির্দিষ্ট সংস্করণের ব্রাউজার ব্যবহারের মধ্যেই। এ ছাড়া পিসি অপারেটিং সিস্টেম ও অফিস সফটওয়্যারের একচ্ছত্র আধিপত্যের কারণেও কম্পিউটার শিল্পের জগতে চারপাশে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটছে সে বিষয়ে মাইক্রোসফটকে অন্ধ করে রেখেছিল। ইন্টারনেটের প্রথম যুগে যেমন শুরু থেকেই দৌড়াতে ভুল করে বসেছিল প্রতিষ্ঠানটি তেমনি আবারও ক্লাউড কম্পিউটিং কিংবা মোবাইল প্রযুক্তিতে ঝাঁপিয়ে পড়তে দেরি করে বসল।
ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার যেহেতু জনপ্রিয়তার শীর্ষে ছিল তাই এর উন্নয়ন ও হালনাগাদ আনতেখুব বেশি গুরুত্ব দেয়নি মাইক্রোসফট। সে সুযোগটিই কাজে লাগিয়ে আরও উদ্ভাবনী ব্রাউজার যেমন অপেরা, সাফারি, ফায়ার ফক্স এমনকি গুগল ক্রোমের আবির্ভাব ঘটে গেল দৃশ্যপটে। নতুন ব্রাউজারগুলোর সঙ্গে ইন্টারনেট এক্সপ্লোরারের তুলনা করতে গেলে এখন ইন্টারনেট ব্রাউজারকে অনেক পুরোনো আর ক্লান্তই মনে হয়। ঠিক যেন হেভিওয়েট বক্সিংয়ের সাবেক কোনো তারকা, যে সময়ের ভারে মোটা আর ভারী হয়ে গেছে।
তবে বিস্ময়কর বিষয় হল যে, ধীরে ধীরে ইন্টারনেট এক্সপ্লোরের ধ্বংস ডেকে আনল যে ব্রাউজার তার নাম ফায়ার ফক্স। মজিলা ফাউন্ডেশনের তৈরি এই ব্রাউজারটি আর মজিলা ফাউন্ডেশন হচ্ছে সেই পুরোনো নেটস্কেপের ধ্বংসাবশেষ থেকে তৈরি হওয়া প্রতিষ্ঠান। কে বলে পৃথিবীতে বিচার নেই!

comments