Search

বিসিএস পরীক্ষার ফলাফল

৩৩ তম বিসিএস লিখিত পরীক্ষার ফলাফল নিন এথানে

pronoy

pronoy

প্রণয় চাকমা
প্রণয় চাকমার নতুন ঠিকানা নেত্রকোনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়। ৩১তম বিসিএস পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফল তাঁকে নিয়ে এসেছে এই ঠিকানায়। সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পদে এই কার্যালয়ে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। খুব বেশি দিন হয়নি চাকরিতে যোগ দিয়েছেন, তাই একটু অবসর পেলেই মন ছুটে যায় রাঙামাটিতে কিংবা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। এই দুই জায়গাতেই যে তিনি ফেলে এসেছেন অসংখ্য স্মৃতি!
প্রণয় চাকমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা রাঙামাটি সদরে। শৈশব-কৈশোরের অনেকটা দখল করে আছে রাঙামাটি সরকারি উচ্চবিদ্যালয় আর রাঙামাটি সরকারি কলেজ। এই দুই প্রতিষ্ঠান থেকেই যথাক্রমে পাস করেছেন মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক। আর ঠিক একই সময়ে মনের মধ্যে গড়ে তুলেছেন এক দুর্দমনীয় স্বপ্ন, ‘ইংরেজি সাহিত্যে পড়ব’। তারপর স্বপ্নপূরণের আশায় উচ্চমাধ্যমিক শেষে একদিন চেপে বসেন ঢাকার বাসে। ভর্তি হন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। হ্যাঁ, ইংরেজি সাহিত্য বিভাগেই।
একটানা বলে চলেছেন জীবনের গল্প। এ পর্যায়ে এসে একটু থামেন। লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে আবার বলতে শুরু করেন, ‘আমি কিন্তু খুব একটা মেধাবী নই। মানে, ওই যে বলে না, “জন্মসূত্রে মেধাবী” সে রকম কিছু না। আমি উন্নতি করেছি ধাপে ধাপে, পরিশ্রম আর ধৈর্যের বলে।’
প্রণয়ের বাবা অবসরপ্রাপ্ত বন কর্মকর্তা মনো কুমার চাকমা। মা নিশি চাকমা গৃহিণী। সংসারে আছেন আরও এক ভাই ও এক বোন। ‘এই মানুষগুলোর উৎসাহ আর সহযোগিতায় এত দূর এসেছি এবং যেতে চাই আরও অনেক দূর।’ এক নিঃশ্বাসে যখন কথাগুলো বলছিলেন প্রণয় তখন তাঁর চোখে ফুটে উঠছিল সুদূরের হাতছানি।

তাপ্তি চাকমা
বাবা খাগড়াছড়ি জেলার তথ্য অফিসার। মা রূপালী ব্যাংকের সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার। মা-বাবার পথ অনুসরণ করে মেয়েও এবার নামের শেষে যুক্ত করলেন ‘সরকারি কর্মকর্তা’ পদবি। বলা হচ্ছে মঙ্গল মণি চাকমা, সারগরিকা খীসা ও তাঁদের মেয়ে তাপ্তি চাকমার কথা।
খাগড়াছড়ির খবংপুড়িয়ায় জন্ম নেওয়া এই সুকন্যার শৈশব, কৈশোর ও বেড়ে ওঠা চট্টগ্রামেই। মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়ালেখা করেছেন খাগড়াছড়ি সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে আর উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পড়েছেন খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজে। এরপর স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগ থেকে। বেশ কৃতিত্বপূর্ণ শিক্ষাজীবনই বলা চলে। কিন্তু তাপ্তি বলেন ভিন্ন কথা, ‘পুরো শিক্ষাজীবনে আমার বড় রকমের কোনো কৃতিত্ব নেই। তবে সাফল্য আছে বলতে পারেন। আহামরি ফলাফল করতে না পারলেও কখনো বিফল হইনি। মধ্যম মানের ফলাফল ধরে রেখেছি সব সময়।’
সেই মধ্যম মানের শিক্ষার্থী তাপ্তি চাকমাই কর্মজীবন কীভাবে শুরু করলেন সেরা সাফল্য দিয়ে। ৩১তম বিসিএস পরীক্ষায় চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ হয়ে যোগ দিয়েছেন প্রশাসন ক্যাডারে। টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সহকারী কমিশনার পদে সম্প্রতি শুরু হয়েছে তাঁর কর্মজীবন।
যদিও তাপ্তির প্রবল ইচ্ছা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার, সে পথে কাঠখড়ও পুড়িয়েছেন বিস্তর; কিন্তু শেষ পর্যন্ত হতে পারেননি বলে মনে খেদ নেই তাঁর। তিনি মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে না পারাটা তাঁর জন্য বরং শাপেবরই হয়েছে। কে জানে, শিক্ষক হলে হয়তো বিসিএস ক্যাডার হওয়া হতো না! বলছিলেন তাপ্তি চাকমা।

নিপুণ চাকমা
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে স্নাতক শেষ করে মনে হলো তাঁর বিসিএস পরীক্ষা দেওয়া উচিত। কেন এমন মনে হলো নিপুণ চাকমার? তখন অবশ্য এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাননি তিনি। উত্তর পেয়েছেন ৩১তম বিসিএসে কাস্টমস ক্যাডারে নিয়োগ পাওয়ার পর। ‘আসলে মা-বাবাকে দেখেই আমার মনে দানা বেঁধেছে এই স্বপ্ন।’ বলছিলেন তিনি। কারণ, নিপুণের বাবা খাদ্য মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা আর মা স্বাস্থ্য পরিদর্শক। ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছেন পরিবারে এই সরকারি আবহ। সর্বশেষ যুক্ত হলেন তিনি নিজে। সহকারী কমিশনার পদে এখন দায়িত্ব পালন করছেন চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে।
খাগড়াছড়ির মাজান (মহাজন) পাড়ায় জন্ম নেওয়া এই মেধাবী তরুণ মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়েছেন খাগড়াছড়ি সরকারি উচ্চবিদ্যালয় থেকে। উচ্চমাধ্যমিকের পাট চুকিয়েছেন ঢাকার রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ থেকে। তারপর বুয়েটে। ইচ্ছা আছে দেশের বাইরে গিয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নেওয়ার। ‘সেটা অবশ্যই সময়-সুযোগ অনুযায়ী। আপাতত যে দায়িত্বে আছি, সেটাই পালন করতে চাই যথাযথভাবে।’ এটুকু বলে সঙ্গে সঙ্গে আবার যুক্ত করেন, ‘আমার আরও একটা ইচ্ছা আছে। বিশ্বসাহিত্যেই সমস্ত ধ্রুপদি বই পড়ে ফেলা। শুনলে হয়তো হাসবেন, একদিন বই পড়তে না পারলে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে আমার।’ বলে নিজেই হেসে ফেলেন।’
খানিক বিরতির পর আবার স্বাভাবিক কণ্ঠে গল্প শুরু করেন তিনি। সেই গল্পে উঠে আসে দেশ নিয়ে স্বপ্নের কথা, আদিবাসীদের নিয়ে স্বপ্নের কথা আর একমাত্র ছোট বোন পল্লবী চাকমাকে নিয়ে স্বপ্নের কথা। ‘এক বোনকে হারিয়েছি তাতে কি! আরেক বোন তো পড়ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ওকে ঘিরেই এখন আমার যত স্বপ্ন।’

তুষিতা চাকমা
‘স্টিডি উইনস দ্য রেস’ কথাটা যে কেবল গল্পের উপদেশবাণী নয়, তা বোঝা যায় তুষিতা চাকমাকে দেখলেই। শিক্ষাজীবনে তাক লাগানো ফল নেই তাঁর। আছে কেবল সংকল্পে অপরিসীম ধৈর্য। তাই তো মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে গড়পড়তা ফলাফল তাঁকে দমাতে পারেনি। বরং বেগবান করেছে। তা বোঝা যায়, যখন মেধাতালিকায় স্থান পেয়ে তুষিতা ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে। এই সাফল্যের হাত ধরে আসে ৩১তম বিসিএস পরীক্ষায় চূড়ান্ত সাফল্য। তিনি নিয়োগ পান পররাষ্ট্র ক্যাডারে।
তুষিতার এই ‘সংকল্পে অটল’ জীবনের শুরু রাঙামাটির ব্যাপটিস্ট মিশনারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এরপর কাপ্তাইয়ের কে পি এম স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে মাধ্যমিকও উচ্চমাধ্যামিক। তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি প্রস্তুতির জন্য প্রিয় কাপ্তাই ছেড়ে চলে আসেন রাজধানী ঢাকায়। শুরু হয় হোস্টেলে বা মেসে আর দশটা মেয়ের মতোই টিকে থাকার লড়াই। ‘জীবন মানেই তো লড়াই। কিংবা জীবনের আরেক নাম তো সংগ্রাম। তবে লড়াই-সংগ্রাম যত কঠিনই হোক না কেন, আমি হেরে যেতে নারাজ।’ এ যেন আর্নেস্ট হেমিংওয়ের কণ্ঠস্বর, ‘মানুষকে ধ্বংস করা যেতে পারে কিন্তু পরাজিত করা যায় না।’
হ্যাঁ, পরাজিত না হওয়ার সংকল্প নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যুক্ত হয়েছেন তিনি। শেষ পর্যন্ত সংকল্প ধরে রাখতে চান শিক্ষক মা আর চিকিৎসক বাবার ‘লক্ষ্মী তুষিতা’।

comments




Leave a Reply

Your email address will not be published.