Search

যৌথ প্রযোজনা নাকি যৌথ প্রতারণা ? পশ্চিম বাংলার প্রতারনা

দুই দেশের যৌথ প্রযোজনার নামে যত অনিয়ম

যৌথ প্রযোজনা নাকি যৌথ প্রতারণা ?

যৌথ প্রযোজনা নাকি যৌথ প্রতারণা ?

প্রথমবারের মতো বাংলাদেশি সিনেমা পরিচালনা করতে আসা ভারতীয় গায়ক ও চিত্রপরিচালক অঞ্জন দত্ত এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “পশ্চিমবঙ্গের সিনেমা ব্যবসা ‘হুমকি’র মুখে পড়েছে। তামিল ও হিন্দি সিনেমার প্রতিই ঝুঁকছে পশ্চিমবঙ্গের দর্শক। তাই তাদের অনেকের নজর বাংলাদেশের বাজারে।” অঞ্জন দত্তের এ মন্তব্য অনুধাবন করলেই বোঝা যাবে বাংলাদেশের দর্শকদের প্রতি কলকাতার নির্মাতাদের আগ্রহ এবং নজর কতটুকু। সরাসরি বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশ করতে না পারা এসব নির্মাতারা এক প্রহসনমূলক নিয়মের আশ্রয় নিচ্ছেন। এর নাম ‘যৌথ প্রযোজনা’। এ যৌথ প্রযোজনার মাধ্যমে বাংলাদেশের বাজারে এরই মধ্যে ঢুকে পড়েছে কয়েকটি ছবি। বাংলাদেশ থেকে টাকা কামিয়ে ওপারে চালানও করে দিয়েছেন সব- এমন তথ্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য সূত্রের। যৌথ প্রযোজনার নামে বাংলাদেশী দর্শক এবং সরকারকে বোকা বানিয়ে যেসব কর্মকাণ্ড করা হয়েছে তাতে করে ‘যৌথ প্রযোজনা’ এখন ঢাকার ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে ‘যৌথ প্রতারণা’ নামেই প্রতিষ্ঠিত। এর বিরুদ্ধে বাংলাদেশী ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে আন্দোলন-সমালোচনার নামে যেটুকু হয়েছে সেটা ছিল লোক দেখানো। নিয়মের বেড়াজালে আটকে পড়ে সেসব সমালোচনা কিংবা আন্দোলন শেষ পর্যন্ত ধোপে টেকেনি।

ঢাকার ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে যৌথ প্রযোজনার চল শুরু হয় ১৯৭৩ সালে। আলমগীর কবিরের পরিচালনায় ‘ধীরে বহে মেঘনা’ ছবির মাধ্যমে চালু হয় এ প্রক্রিয়া। একই বছর ঋত্বিক ঘটকের পরিচালনায় যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ ছবিটি মুক্তি পায়। শুধু ভারতের সঙ্গেই নয়। ১৯৮৩ সালে ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সম্মিলিত প্রযোজনায় নির্মিত হয় ‘দূরদেশ’ ছবিটি। এরপর থেমে থেমে যৌথ প্রযোজনায় ছবি নির্মিত হতে থাকে। যদিও সে সময়কার নিয়ম-কানুন ছিল অনেকটা কড়াকড়ি। সবচে বড় কথা হচ্ছে, নিয়মমাফিক কাজ করতেন তখনকার নির্মাতারা। তাই যৌথ প্রযোজনার ছবি নিয়ে ততটা উচ্চবাচ্য হয়নি তখন। এমনিতেই যৌথ প্রযোজনার ক্ষেত্রে কিছু শর্ত মেনে চলতে হয়। ১৯৮৬ সালের যৌথ প্রযোজনার নীতিমালায় সব দেশের শিল্পীদের সমান হারে অংশগ্রহণের নিশ্চয়তা বাধ্যতামূলক ছিল। কিন্তু ২০১২ সালে এসে সে নীতিমালায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিশেষ একটি মহলকে সুবিধা করে দিতে নতুন নীতিমালায় বলা হয়েছে, ‘দুই দেশের নির্মাতা আলোচনার মাধ্যমে নির্মাণের বিষয়ে যাবতীয় সিদ্ধান্ত নেবেন।’ মূলত এ সিদ্ধান্তের অপব্যবহার করে যৌথ প্রযোজনার সুবিধা এখন অনেকেই যৌথ প্রতারণায় শামিল হয়েছেন। এর জলজ্যন্ত উদাহরণ গেল বছর মুক্তিপ্রাপ্ত ‘আমি শুধু চেয়েছি তোমায়’ ছবিটি। এ ছবিতে নায়ক-নায়িকা চরিত্রে বাংলাদেশের কাউকেই সুযোগ দেয়া হয়নি।

বাংলাদেশের নামসর্বস্ব একটি প্রতিষ্ঠান ভারতের এসকে মুভিজের সঙ্গে যৌথভাবে ছবিটি নির্মাণ করে। মূলত কলকাতার এসকে মুভিজেরই ছবি ছিল এটা। বাংলাদেশী বাজার দখল করার জন্যই যৌথ প্রযোজনা’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। কারণ বাংলাদেশে ব্যবহৃত ছবি পোস্টারে পরিচালকের নামের জায়গায় অনন্য মামুন ও অশোকপাতির নাম লেখা থাকলেও ভারতে সাঁটানো কোনো পোস্টারেই বাংলাদেশী পরিচালক, গীতিকার কিংবা প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করা হয়নি। সে সময় ছবিটি বাংলাদেশে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিল। কিন্তু প্রশাসনের নির্লিপ্ততায় পার পেয়ে যায় প্রতারকরা। বিশাল অংকের অর্থ বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়ে যায় তখন। প্রশাসনিকভাবে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেয়ার কারণে এ ছবিকে উপজীব্য করে এরপর আরও কয়েকটি ভারতীয় ছবি যৌথ প্রযোজনার নাম দিয়ে বাংলাদেশে মুক্তি পায়। এর মধ্যে ‘রোমিও ভার্সেস জুলিয়েট’ অন্যতম। এ ছবির ক্ষেত্রে তাই ঘটেছে। বাংলাদেশে সাঁটানো অনেক পোস্টারে পরিচালকের নাম ছিল না। কিছু পোস্টারে আবদুল আজিজ ও অশোকপতির নাম দেখা গেলেও ভারতে সাঁটানো কোনো পোস্টারেই আবদুল আজিজের নাম দেখা যায়নি। এ ক্ষেত্রে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানদ্বয় প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছেন বলে জানা গেছে।

যৌথ প্রযোজনায় কেন ছবি নির্মাণ করতে হবে? বাংলাদেশে কী সিনেমায় লগ্নিকারকের অভাব? এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে যৌথ প্রযোজনার প্রতি নির্মাতা এবং প্রযোজকদের কিছু যৌক্তিক মন্তব্য পাওয়া গেছে। নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশে সিনেমা হলের সংখ্যা ১২শরও অধিক ছিল। ২০১০ সালের পর সে সংখ্যা কমে গিয়ে প্রায় ৪০০-তে দাঁড়িয়েছে। দর্শক শূন্যতায় হল মালিকরা সিনেমা ব্যবসার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। তাই সিনেমা সংশ্লিষ্টরা দেশীয় চলচ্চিত্র শিল্পকে বাঁচাতে যৌথ প্রযোজনার প্রয়োজনীয়তার প্রতি গুরুত্ব দেন। যদিও বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের দর্শক একসঙ্গে ছবি দেখেন তাহলে সিনেমা ব্যবসা প্রাণ ফিরে পাবে। পাশাপাশি বাংলাদেশী সিনেমাকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দেয়াও ছিল একটি লক্ষ্য। মূলত এ চিন্তা-ভাবনা থেকেই যৌথ প্রযোজনার প্রতি আগ্রহী হন নির্মাতারা। কিন্তু তখন হোঁচট খেতে হয়েছিল বাংলাদেশের দর্শকনন্দিত নায়িকা শাবানাকে। ২০১২ সালে শাবানা যৌথ প্রযোজনার একটি ছবি নির্মাণের জন্য কলকাতা গিয়ে শ্রাবন্তী, কোয়েলদের পাননি। তারা কেউই যৌথ প্রযোজনায় বাংলাদেশের ছবিতে অভিনয় করতে রাজি হননি। কিন্তু বাংলাদেশের বাজারে প্রতারণার মাধ্যমে কলকাতার ছবি ঢুকে যাওয়ার পর এখন কলকাতার দেব, জিতদের মতো নায়কও যৌথ প্রযোজনার ছবিতে অভিনয়ের জন্য মুখিয়ে আছেন। এরজন্য অবশ্য আমাদের বাংলাদেশী কিছু প্রতারক দায়ী। ‘আমি শুধু চেয়েছি তোমায়’ হিট হওয়ার পর যৌথ প্রযোজনার হিড়িক পড়েছে। গেল বছরই যৌথ প্রযোজনার ছবির ঘোষণা এসেছে ছয়টির মতো। সর্বশেষ গেল মাসে কলকাতায় গৌতম ঘোষ ‘শঙ্খচিল’ নামে একটি ছবি যৌথ প্রযোজনায় নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছেন। এর আগে তিনি যৌথ প্রযোজনায় নির্মাণ করেছিলেন ‘মনের মানুষ’ ছবিটি। আমাদের দেশীয় তারকাদের মধ্যে চিত্রনায়ক ফেরদৌস এবং শাকিব খানও কলকাতার সঙ্গে যৌথ প্রযোজনার ছবি নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছেন গেল বছর। যদিও সেসব ছবির কার্যক্রম এখনও শুরু হয়নি।

১৭৭৩ সাল থেকে শুরু হওয়া যৌথ প্রযোজনার প্রক্রিয়ায় এ পর্যন্ত ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, তুরস্ক, যুক্তরাষ্ট্র, শ্রীলংকাসহ সাতটি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশে ৫০টিরও অধিক ছবি নির্মিত হয়েছে। আরও কিছু ছবি নির্মাণাধীন রয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে, এ পর্যন্ত যতগুলো ছবি যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত হয়েছে, তার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বঞ্চিত হয়েছে বাংলাদেশ। শুধু তাই নয়, যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত কিছু ছবি বিদেশী ভাষায় নির্মাণ করে শুধু বাংলায় ডাবিং করে চালিয়ে দেয়া হয়েছিল। যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত অনেক ছবির ভিডিও রাইটও বাংলাদেশের ছিল না। কিছু বাংলাদেশী নির্মাতা দেশের সঙ্গে নিত্যই প্রতারণা করে যাচ্ছেন। ভারতীয় ছবিতে যৌথ প্রযোজনার নামে নির্বিঘ্নে বাংলাদেশে ব্যবসা করার সুযোগ করে দিচ্ছেন। প্রকারান্তরে বাংলাদেশী অর্থ ভারতে পাচার করছেন তারা। এ বিষয়ে নীরব ভূমিকা পালন করছেন ঢাকার অনেক চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব। দেশীয় শিল্প নষ্ট করে দেশের অর্থ বিদেশে নির্বিঘ্নে পাচার করে দেয়ায় যৌথ প্রযোজনার বিষয়টি নিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেক দেশপ্রেমী চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বরা প্রশ্ন তুলেছেন, এটা কী ‘যৌথ প্রযোজনা’ নাকি যৌথ প্রতারণা’?

Taken from Jugantor

comments

Reviews

  • 8
  • 8
  • 7
  • 8
  • 7
  • 7.6

    Score