Search

শিক্ষকের সটাং সটাং

সটাং সটাং
লেখক : রবিউল ইসলাম সোহেল

শিক্ষকের সটাং সটাং

শিক্ষকের সটাং সটাং

রাত ১২ টা—ক্লাস ওয়ান এন্ড টু।
মা : বাবা আয় ঘুমাবি অনেক রাত হয়েছে।
ধ্রুব : আর একটু পড়েই ঘুমাবো মা। (মা সারাদিন কৃষি কাজ করে করে হয়রান, আমি বিছানায় গেলে তবেই মা ঘুমাবে )। ক্লাস রোল ছিল ২ এবং ৩

ক্লাস থ্রি
শিক্ষক: তোমাদের তাহলে পড়া থাকল ৩ নং পেজ ঠিক আছে । কালকে সবাই পড়া করে আসবে। আজ ছুটি। আবার কাল আসবে।

পরদিন: শিক্ষক: পড়া কাদের হয়নি তারা দারাও । সপ্না আমার রুম থেকে একটা বেত নিয়ে আস (সপ্নার ফার্স্ট রোল বাবা)। নিয়ে আসা বেত দিয়ে সটাং সটাং । যা বস পড়া না করলে কাল আরো পিটাব। রোল ৩

ক্লাস ৪: সকাল ৯ টা, ক্লাস ১০ টায়।
ধ্রুব : গনিতের বাড়ির কাজতো কিছুই করা হয়নি। উহ ! উনি যা জোরে জোরে পিটায় (বেত দিয়ে মারে)। আজ আমি ক্লাসে যাবনা। মা …. মা কই…. আমার খুব পেট ব্যাথা করতেছে (এই ব্যাথা ১০:১৫ পর্যন্ত)। রোল ৮

ক্লাস ৫:
ধ্রুব: ১৫-২০ ব্রাকের ছাত্র ভর্তী হলো আমাদের ক্লাসে। সারা বছর কম বেশি ভালই সটাং সটাং । নিজেদের জমির অনেক কাজেই আব্বুকে সাহায্য। (সবার শুক্রবার মানেই রেস্ট কিন্তু আমাদের দুই ভাইয়ের উল্টোটা, শুক্রবার মানেই ‘বাপরে বাপ’। আব্বু বাসায় থাকত, নিজে তিন কামলার কাজ একা করত সাথে আমরা দুই ভাই দুই কামলা, কাজে নেওয়া লোক সহজে দম (রেস্ট) নিতে পারত না,)। ৫ম শ্রেণীর বিদায় রোল কয়েক জনের পরে আর কয়েক জনের আগে কারন ৫ ক্লাসের সবাইকে বাইরে দার করিয়ে সিরিয়ালি বলে গিয়েছিল।

ক্লাস ৬ : বন্দে আলী মিয়া স্কুল
ধ্রুব: ভর্তী হতে গেলাম। নাম হলো মো: কাদেরিয়া রহমান ধ্রুব। খেলা ছারা কিছু বুঝিনা। হিরো সাইকেল চালিয়ে স্কুল যাই রোজ। কিছু পড়ে যাই কিছু পড়িনা। সারাটা বিকাল ক্রিকেট খেলি, ক্লান্ত শরীরে পড়তে বসলেই চোখে ঘুম চেয়ার টেবিলে। অন্য ঘর থেকে মা বলে ‘কই পড়াতো শোনা যায় না…….’ ধুচমুচে উঠে মা পড়তেছিতো। ভর্তী রোল হলো ১৯।

ক্লাস ৭
টিফিনের পর ৫ম ক্লাস নিত হুজুর স্যার। আজো তার নাম জানিনা। তিনি সকল ক্লাসের ইসলাম শিক্ষা পড়াতেন তাই হুজুর । ক্লাসে এসে নিজ চেয়ারে বসে ‘তুই পড়, তুই পড় আর তুই পড়’ । এভাবে ৭-৮ জনকে একবারে পড়তে বলে আরামে বসে আছেন। ছাত্ররা একে একে ‘স্যার আমার পড়া শেষ’ । কার কার হয়নি ? সোজা গিয়ে রাস্তায় কাছে কান ধরে দারিয়ে থাক (হাইওয়ে রাস্তা)। রাস্তার সবাই দেখে দেখে মজা পায় আর আমরা অপমানিত হই।
শিক্ষক : কে কে দুপুরের নামাজ পরিস নি ? সবাই পড়েছে।
রিপন তুই পরেছিস ? জি হুজুর।
তাহলে যে তোকে গার্লস স্কুলে দেখলাম ? স্যার মানে … আমি মানে….
শিক্ষক : ইসরাইল জোড়া বেত নিয়ে আস।
ব্যাস …. সটাং সটাং
ক্লাস রোল ১৩

ক্লাস ৮
ভূগোল টিচার তফাজ্জল স্যার ওরফে তফে স্যার। অসম্ভব মেধা শক্তি। গত কাল কে স্কুলে আসেনি তা কখনো খাতা দেখতে হয়না। ক্লাসে ঢুকেই স্যারের প্রথম কাজ ‘ এ তুই দারা, তুই, তুই আর তুই। যত জন গতকাল আসেনি ঠিক তারাই এই তুইয়ের কাতারে পড়েছে। স্যার : তোরা গতকাল আসিস নাই কেন ? বেত দিয়ে কানের উপর খুব জোরে জোরে সটাং সটাং। স্যার এস এস সি পাস করার পর এক বছর মহিষের গাড়ি চলাত পড়ে ঐ যোগ্যতায়ই চাকরীতে আসে এবং পর্যায় ক্রমে ডিগ্রী পাস করে। স্কুলের পাশেই কালামের ফটোস্টাটের দোকান থেকে কম্পোজ করে করে নিত আমাদের সামনেই ডিগ্রী পরীক্ষার জন্য। তিনি আজও পড়ান তবে খোদাই জানে তিনি আজও ভুগোলের সঙ্গা জানেন কিনা।
ক্লাস রোল ১৪

ক্লাস ৯
আমার বিশাল নাম খানি রেজিস্ট্রেশনের সময় মো: কাদেরিয়া রহমান করে দেয়া হয়। কেরানী মোশাররফ স্যার এই কাজটি করেন। বুঝেছি এই জ্বালা চাকুরীর ভেরিফিকিশনের সময়। হুজুর স্যার একদিন ক্লাসে এসে আমাকে সামনে ডাকলেন।
কাছে যাওয়াতেই বলে ‘ফরিদ বেত নিয়ে আয়’
শিক্ষক : টেবিলের নিচে মাথা দে। দিলাম
একটা করে টান টান পাছার উপর সটাং আর একই কথা কয়টা প্রেম করিস বল ?
আমি এসবের কোন মানেই বুঝিনি। আমার মধ্যে তখন অবধি রোমান্টিক কিছু কাজ করত না, তবে অনেক বন্ধু টিফিনের সময় উপজেলা প্রাঙ্গনে দেখা করত মেয়েদের সাথে, উপহার দিত নিত। হ্যা একটা মেয়ের কথা মনে পড়ে তখন লিপি নামক একটা মেয়েকে দু তিন জন পছন্দ করত শুধু এতটুকো জানি যার মধ্যে আমার কাছের বন্ধু ফরিদও ছিল। (ফরিদ চট্র মেডিকেলে পড়ত পরে সুইসাইড করে)। যাই হোক সারাটা ক্লাস আমার মাথা স্যারের টেবিলের নিচে আর স্যার একটু পরে পরে সটাং সটাং।
ক্লাস রোল ১৯

ক্লাস ১০
প্রতিদিন ব্যাট বল নিয়ে ক্লাসে যাওয়া। নতুন ক্রিড়া শিক্ষক ইয়াছিন স্যারের আগমন। স্যারের সাথে স্কাউট করা। ক্লাস ফাকি দিয়ে স্ট্যাডিয়াম মাঠে গিয়ে ক্রিকেট খেলা ইত্যাদি। স্যাররা যথা রীতি প্রতিদিন সটাং সটাং। শাহজামাল স্যারের কাছে অংক পড়তে যাই, গনিত কম পারি।
শিক্ষক: ‘লসাগু করো’ বলে আরেকজনের দিকে মনোযোগ।
আমি জানি না কিভাবে লসাগু করে। চুপ করে বসে আছি।
শিক্ষক : লসাগু করোনি ? না স্যার আমি পারিনা।
শিক্ষক : সবার উদ্দেশ্যে ‘এই দেখ আমার এই ছাত্রতো লসাগু করতেই পারেনা’ বলে সবাই মিলে হাসি আর ঠাট্রা করে। আর কোন দিন অংক পড়তে যাইনি।
পরীক্ষায় অংশগ্রহন এবং গনিতের জন্য ভাল রেজাল্ট করতে না পারা।

পরের ক্লাসগুলিতে মোটামুটি ভাল টিচারের ক্লাস পেয়েছি

আজ আমি একজন এস আই । তিন একাধিক বার বিসিএস লিখিত পরীক্ষা দিয়েছি কিন্তু গনিতে ভাল করতে না পারায় ভাল ফল পাইনি।

শুধু মায়ের কাছে যখন শিখেছিলাম ছোটবেলায় তখন আমার আগ্রহ ছিল সেলফ কনফিডেন্স ছিল কিন্তু ধীরে ধীরে টিচার নামী লোকদের সটাং সটাং খেয়ে স্কুল মানেই ভয়ের একটা যায়গা, যেখানে শাস্তি দেওয়া হয় জেনেই বেড়ে ওঠা। কিন্তু বড়ই দু:খের কথা আজও তারাই আছে ঐ স্কুলটিতে। তাদের গুনগত মান ঠিক আগেরই মত। শুধু নতুন কিছু স্যার বাদে।

আমার মেধা আর শৈশবের স্বপ্ন মাখা দিনগুলি সব কেড়ে নিয়েছে ঐ সটাং সটাং। আমার নিজের শুরুটা যেখানে ছিল সেখান থেকে কোন উন্নতি নয় চরম অবনতি হয়েছে। তাদের সটাং সটাং কি দায়ী নয় ?

এই ধ্রুবটাই আমি যিনি সারা জীবন সটাং সটাংয়ের শিকার ঘরে আর ক্লাসে, আমিও দুষ্টু কম ছিলাম না ।

comments