Search

সূর্য হেলে থাকে জাবেল হাফিত পর্বতে | আরব আমিরাত থেকে

ঘুরে আসুন আরব আমিরাতের অন্যতম সেরা টুরিজম স্পট থেকে

সূর্য হেলে থাকে জাবেল হাফিত পর্বতে

সূর্য হেলে থাকে জাবেল হাফিত পর্বতে

কারণে অকারণে ঘুরেছি আমিরাতের সবক’টি বিভাগে। দেখেছি, উপলব্ধি করেছি আর সময় ব্যয় করেছি কৃত্রিমভাবে গড়ে তোলা আমিরাতের সৌন্দর্যের মোহে। কখনও চোখ আটকে গেছে এখানে, কখনও বা ফিরতে চায়নি মন আপন ঘরে। আবার কখনও ঘরে ফিরেও স্মৃতি কাতর ছিলাম বেশ সময়। আমিরাতে পেশাগত কাজ ও ব্যক্তিগত প্রয়োজনে বেশ কয়েকবার দেশে-বিদেশে যাওয়া আসায় খানিকটা ঝিমিয়ে পড়েছিলাম। ইচ্ছা করেই দুবাই শহর থেকে বেশ দূরে থেকেছি। তবে আমাদের মতো ভ্রমণপিয়াসীরা একেকটি এলাকা থেকে যতই দূরে সরে যাওয়ার চেষ্টা করি ততই নতুন এলাকা নতুনত্ব আমাদের ভিন্নভাবে বাঁচতে শেখায়। প্রেম ভালোবাসায় জড়িয়ে নেয় আপন মায়ায়। বেশ কিছুদিন আবুধাবিতে থাকায় মনে হল দুবাই থেকে অনেকটা খোলামেলা আরব উপসাগরীয় এ অঞ্চল। কিছুদিন রয়েও গেলাম আবুধাবি সিটিতে।
শুক্রবার, ছুটির দিন। এনটিভির আরব আমিরাত প্রতিনিধি শিবলী সাদিক ভাই ফোন করে বললেন, ‘চলো, আল আইন যাই। মজা হবে, আমরা আরও বেশ কয়েকজন যাচ্ছি।’ সাড়া দিলাম, ‘যাব’। আগেই বলেছি, আমাদের মতো ভ্রমণপিপাসুরা প্রকৃতির প্রেমে পড়ি বারবার, প্রকৃতির এ মায়া ছাড়া অন্তত আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তার আমন্ত্রণে সাড়া দিতে হল। আবুধাবি থেকেও অনেক বেশি খোলামেলা শহর আল আইন। যাত্রা শুরু করি আবুধাবি থেকে। আগেই জেনেছি ‘ফ্যামিলি ট্যুরে’ দুবাই থেকে আসছেন সাইদুর রহমান শাহীন ভাই, সাম্মী সামাদ সুমি আপু সঙ্গে তাদের ছোট্ট সাফোয়ান। শাহীন ভাই ও সুমি আপুর সঙ্গে বেশ কয়েকবার দেখা হয়েছিল দুবাইতে। সে হিসেবে তারা আমার পরিচিত। পরিচিতজনদের সঙ্গে ভ্রমণের পূর্ণ স্বাদ নেয়া যায়। এ জন্য আগ্রহ একটু বেশিই। ভাড়ায়চালিত বাসে করে আল আইন-আবুধাবি সড়ক হয়ে সরাসরি পৌঁছে যাই আল আইন সানাইয়া এলাকায়। এলাকাটি আমার জন্য নতুন। ‘কীভাবে যেতে হবে জাবেল হাফিত!’ কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করে নিশ্চিত হলাম। সানাইয়া থেকে গাড়ি পরিবর্তন করে যেতে হয় চুনাপাথরের ওই উঁচু পর্বতে। একজন পাকিস্তানির ভাড়ায়চালিত গাড়িতে করে ফের রওনা হলাম গন্তব্যের দিকে। গন্তব্য সমতল থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার উপরে, জাবেল হাফিত পর্বতের চূড়ায়।

আঁকাবাঁকা পথে গাড়ি যতই উপরের দিকে যাচ্ছে ততই বাড়ছে ভয়, তাই নিজস্ব সতর্কতায় সিট বেল্ট লাগিয়ে বসালাম। দেখে বুঝা যায়, পাথরের পাহাড় কেটে কতইনা যত্ন করে তৈরি করা হয়েছে এ রাস্তা। পাশে সারিবদ্ধ ল্যাম্পপোস্ট। গাড়ির জানালা দিয়ে তাকাতেই বাইরের দৃশ্য মনে হয় এ এক অন্য জগৎ। জাবেল হাফিত পর্বতটি আল আইন শহরের উত্তর দক্ষিণে অবস্থিত। ১২৪৯ মিটার এলাকা নিয়ে দঁঁড়িয়ে থাকা পর্বতটি ওমানের বর্ডারের পাশাপাশি। চুনাপাথরে ঘেরা পর্বতটি অনেকটা গুহার মতো। রাস্তার দৈর্ঘ্য ৭ দশমিক ৫ মাইল। পর্বতের ২১ কোণ এবং তিনটি রাস্তা। রাস্তাগুলো জার্মানির প্রযুক্তিতে তৈরি।

প্রায় ৫ হাজার বছর আগে এ পর্বতের মাঝে ৫০০ প্রাচীন সমাধি পাওয়া গেছে। যত উপরের দিকে যাচ্ছে গাড়ি, ততই যেন একেকটি স্তর নিচের দিকে চলে যাচ্ছে। গাড়ি ছুটছে, যেখানে অপেক্ষায় আছেন অন্যরা। প্রায় ১৫ মিনিট সময় নিয়ে এক এক করে সবগুলো স্তর পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম জাবেল হাফিতের চূড়ায়। প্রচুর পরিমাণ গাড়ি। ছুটির দিন হওয়ায় পর্যটকদের সংখ্যাও বেশি। উপচে পড়া ভিড়। এদের বেশিরভাগই এশিয়ান। গাড়ি থেকে নামতেই ঠাণ্ডা হাওয়া শরীরে ঝাটকা দিয়ে গেল। তখন পশ্চিমাকাশে সূর্য হেলান দিয়ে আছে। সূর্যাস্তের আগ মুহূর্তের লাল আভায় রঙিন আকাশ। অধিকাংশ পর্যটকরা সূর্যাস্ত উপভোগ করছে, আর ক্যামেরাবন্দি হচ্ছেন নিজেরা। এমন সময় মুঠোফোনে কল। কথা বলে জানলাম, অপেক্ষারত অন্যরাও ভিড়ের মাঝে আছে। একটু সামনে যেতেই দেখা হল সবার সঙ্গে।

পূর্ব পরিচিত চারজন ছাড়াও নতুন করে পরিচয় হল শেখ ওয়াহিদ রাব্বি ভাই, দিবা আপু, তাদের দু’ছেলেমেয়ে সাফোয়ান ও তুরসার সঙ্গে। রাব্বি ভাই ইত্তেসালাত কোম্পানিতে চাকরি করেন। বেশ আন্তরিক একজন মানুষও বটে। পরিচয় পর্ব শেষ। এখানে দু’জন সাফোয়ান। একজন শাহীন ভাইয়ের ছেলে, অন্যজন রাব্বি ভাইয়ের। রাব্বি ভাইয়ের ছেলে বয়সে বড়। সে হিসেবে তাকে বড় সাফোয়ান বলা যায়। সবাই মিলে সূর্যাস্ত দেখলাম পর্বতের সর্বোচ্চ চূড়া থেকে। ওপর থেকে তাকালে নিচের ঘরগুলো একেকটি পাথরের টুকরার মনে হয়। উঁচু না নিচু বুঝাই যায় না, পুরোটাই সমান লাগে। বেশ ওপরে থাকায় ঠাণ্ডা হাওয়া গায়ে লাগলেও মানুষের ভিড়ে তা অনুভবই যেন হচ্ছিল না। সত্যি বলতে কি, অনেক দিন পরেই যেন আবার ভ্রমণের পূর্ণ স্বাদ লাগালাম। সেখানেও শিবলী ভাইয়ের ডাক, ‘এসো সবাই মিলে ছবি তুলি’। না করার উপায় নেই। বিশ্বের উল্লেখ্যযোগ্য পর্যটন কেন্দ্রগুলোর একটি এই ‘জাবেল হাফিত’। এমন সুন্দর জায়গায় ছবি না তুলে কি পারি! বড় সাফোয়ানের হাতে ক্যামেরা ছিল। কয়েকটি গ্র“প ছবি তোলার পর সিদ্ধান্ত হল সবাই মিলে এবার গ্রিন মুবাজ্জেরা দেখতে যাব। যেই কথা সেই কাজ। ততক্ষণে সন্ধ্যা নেমেছে।

লেখক : সাংবাদিক; দুবাই, আরব আমিরাত

যুগান্তর থেকে নেওয়া হয়েছে

comments