মতামত

যেদিন ভয় পরাজিত হয়েছিল

এম এ মজুমদার প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬ ১ মিনিটে পড়া যাবে

বিপ্লবের ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত থাকে, যার আগে এবং পরে দেশকে আর একই রকম দেখা যায় না। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই বাংলাদেশের জন্য তেমনই একটি দিন। সেদিন রংপুরে নিহত হন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। তবে প্রকৃত অর্থে সেদিন একজন মানুষের মৃত্যু হয়নি। সেদিন মৃত্যুবরণ করেছিল ভয়। জন্ম নিয়েছিল প্রতিরোধের নতুন মনোবিজ্ঞান।

যেকোনো স্বৈরশাসনের সবচেয়ে বড় শক্তি অস্ত্র নয়; ভয়। মানুষকে বিশ্বাস করানো যে, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানেই নিশ্চিত পরাজয়। প্রতিবাদ মানেই বিপদ। নীরব থাকাই নিরাপদ। দীর্ঘ সময় ধরে এই ভয়ই মানুষকে ঘরে আটকে রাখে। রাস্তা ফাঁকা করে। বিবেককে নীরব করে।

১৬ জুলাই সেই হিসাব পাল্টে যায়।

আরও পড়ুন

আবু সাঈদের মৃত্যু শুধু ক্ষোভ তৈরি করেনি। মানুষের মন থেকে ভয়ও সরিয়ে দিয়েছিল। লাখো মানুষ বুঝে যায়, একজন তরুণ যখন বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে পারে, তখন অন্যায়ের সামনে চুপ করে থাকা আর সম্ভব নয়। এ কারণেই আবু সাঈদের শাহাদাতকে শুধু একটি হত্যাকাণ্ড হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি ছিল এক মানসিক বিপ্লবের সূচনা।

কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন কয়েক সপ্তাহ ধরে চলছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাজপথে ছিলেন। দাবি ছিল নির্দিষ্ট। লক্ষ্যও স্পষ্ট। কিন্তু আন্দোলনের ভৌগোলিক বিস্তার তখনও সীমিত ছিল। ১৬ জুলাইয়ের পর সেই সীমা ভেঙে যায়। আন্দোলন আর কেবল কোটার মধ্যে আটকে থাকেনি। মানুষের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের আচরণ, ক্ষমতার ব্যবহার ও নাগরিকের অধিকার।

একটি জাতি কখন বিদ্রোহ করে? যখন মানুষের মনে এই বিশ্বাস জন্মায় যে, হারানোর আর কিছু নেই। আবু সাঈদের মৃত্যু সেই বিশ্বাস ত্বরান্বিত করেছিল। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষ বলতে শুরু করে– যদি একজন নিরস্ত্র শিক্ষার্থীও গুলির শিকার হন, তাহলে নীরব থাকলেও নিরাপত্তা নিশ্চিত নয়। অন্যায়ের সামনে নত হওয়া সমস্যার সমাধান নয়। বরং প্রতিবাদই পথ। এই উপলব্ধিই আন্দোলনের গতিপথ বদলে দেয়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ছাত্রসমাজ বহুবার পরিবর্তনে নেতৃত্ব দিয়েছে। ১৯৫২, ১৯৬৯, ১৯৭১, ১৯৯০—প্রতিটি বাঁকেই শিক্ষার্থীরা সামনে ছিলেন। ২০২৪ সালও সেই ধারার আরেকটি অধ্যায়। তবে এই অধ্যায়ের বিশেষত্ব হলো, প্রযুক্তির যুগে একটি দৃশ্য কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পুরো দেশকে এক সুতোয় বেঁধে ফেলে।

মানুষ শুধু খবর শোনেনি। মানুষ ঘটনাটি দেখেছে। চোখের সামনে দেখেছে, একজন তরুণ শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পিছিয়ে যাননি। এই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার অভিঘাত ছিল অসাধারণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর লাখো মানুষ একই প্রশ্ন তুলেছেন—রাষ্ট্র কি এতটাই অসহিষ্ণু যে, একজন শিক্ষার্থীকেও প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই মানুষ রাজপথে নেমেছিল।

স্বৈরশাসন কখন দুর্বল হয়ে পড়ে? যখন মানুষের মনে ভয় কাজ করা বন্ধ করে। অস্ত্র তখনও থাকে। বাহিনীও থাকে। আইনও থাকে। কিন্তু ভয় যদি ভেঙে যায়, তাহলে ক্ষমতার সবচেয়ে বড় ভিত্তিটাই নড়ে যায়। ১৬ জুলাইয়ের পর বাংলাদেশের পরিস্থিতি ঠিক এমনই হয়েছিল।

আবু সাঈদের শাহাদাতের পর একের পর এক শহীদ হয়েছেন আরও অনেকে। অসংখ্য মানুষ আহত হয়েছেন। পরিবার হারিয়েছে তাদের প্রিয়জন। কিন্তু প্রতিটি মৃত্যু আন্দোলনকে থামায়নি। বরং আরও বিস্তৃত করেছে। এটিই ইতিহাসের নির্মম কিন্তু বাস্তব শিক্ষা। অন্যায় যখন সীমা অতিক্রম করে, তখন দমন-পীড়ন প্রতিরোধকে আরও শক্তিশালী করে।

আবু সাঈদের জীবন নিয়েও ভাবা প্রয়োজন। তিনি কোনো ধনী পরিবারের সন্তান ছিলেন না। ক্ষমতার বলয় থেকেও আসেননি। তাঁর পরিচয় ছিল একজন সাধারণ শিক্ষার্থী। বাংলাদেশের লাখো তরুণের মতো তাঁরও ছিল স্বপ্ন। পরিবারকে বদলে দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা ছিল। নিজের জীবন গড়ার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু সময় তাঁকে অন্য এক দায়িত্বের সামনে এনে দাঁড় করায়।

একটি রাষ্ট্রের শক্তি তার অস্ত্রে নয়। তার ন্যায়বিচারে। একটি সরকারের শক্তি তার দমননীতিতে নয়। জনগণের আস্থায়। একটি জাতির শক্তি তার স্মৃতিতে নয়। সেই স্মৃতি থেকে শিক্ষা নেওয়ার সক্ষমতায়। এ কারণেই ১৬ জুলাই শুধু শোকের দিন নয়। এটি প্রতিজ্ঞার দিন।
ইতিহাসের অদ্ভুত নিয়ম— যাঁরা ইতিহাস গড়েন, তাদের খুব কমই জানেন যে, তাঁরা ইতিহাস গড়তে চলেছেন। আবু সাঈদও হয়তো জানতেন না, তাঁর নাম একদিন পুরো জাতির স্মৃতির অংশ হয়ে যাবে। আজ তাঁর নাম উচ্চারণ করলে শুধু একজন মানুষকে মনে পড়ে না। মনে পড়ে একটি সময়কে। একটি আন্দোলনকে। একটি জাতির সাহসকে।

আবেগের পাশাপাশি দায়িত্বও আছে। কোনো জাতি যদি শুধু শহীদদের স্মরণ করে, কিন্তু তাদের স্বপ্ন ভুলে যায়, তাহলে সেই স্মরণ অর্থহীন হয়ে পড়ে। আবু সাঈদের স্বপ্ন কী ছিল? একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র। বৈষম্যহীন সমাজ। মানুষের মর্যাদা। রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি। আইনের সমান প্রয়োগ। এই মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে শুধু স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করে শহীদদের প্রতি দায়িত্ব শেষ হয় না।

১৬ জুলাই প্রতি বছর আমাদের দিকে একটি কঠিন প্রশ্নও ছুড়ে দেয়। আমরা কি এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলছি, যেখানে ভিন্নমত প্রকাশ নিরাপদ? যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের দাবি জানাতে পারবে? যেখানে রাষ্ট্রের শক্তি জনগণের বিরুদ্ধে নয়; তাদের সুরক্ষায় ব্যবহৃত হবে? যেখানে আইনের শাসন ব্যক্তি বা দলের পরিচয়ে বদলে যাবে না?

যদি এই প্রশ্নগুলোর ইতিবাচক উত্তর আমরা দিতে না পারি, তাহলে আবু সাঈদের আত্মত্যাগের শিক্ষা অপূর্ণ থেকে যাবে।

একটি রাষ্ট্রের শক্তি তার অস্ত্রে নয়। তার ন্যায়বিচারে। একটি সরকারের শক্তি তার দমননীতিতে নয়। জনগণের আস্থায়। একটি জাতির শক্তি তার স্মৃতিতে নয়। সেই স্মৃতি থেকে শিক্ষা নেওয়ার সক্ষমতায়। এ কারণেই ১৬ জুলাই শুধু শোকের দিন নয়। এটি প্রতিজ্ঞার দিন। নিজেদের বিবেক নতুন করে জাগিয়ে তোলার দিন। ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকার দিন। গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও জবাবদিহির মূল্য আবারও স্মরণ করার দিন।

আবু সাঈদের শাহাদাত বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি স্থায়ী মাইলফলক হয়ে থাকবে। কারণ তিনি দেখিয়ে গেছেন, একজন সাধারণ তরুণও ইতিহাসের গতি বদলে দিতে পারেন। একটি সাহসী অবস্থান কোটি মানুষের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ছড়িয়ে দিতে পারে। একটি আত্মত্যাগও একটি জাতিকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করতে পারে।

ইতিহাসে অনেক মৃত্যু আছে, যা শুধু পরিবারের শোক হয়ে থাকে। আবার কিছু মৃত্যু আছে, যা পুরো জাতির স্মৃতিতে স্থায়ী হয়ে যায়। আবু সাঈদের শাহাদাত দ্বিতীয় ধরনের ইতিহাস। সময় যত এগোবে, এই ঘটনার রাজনৈতিক বিশ্লেষণ হবে। গবেষণা হবে। বই লেখা হবে। প্রামাণ্যচিত্র নির্মিত হবে। নতুন প্রজন্ম জানবে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে এক তরুণের আত্মত্যাগ কীভাবে একটি আন্দোলনের গতিপথ বদলে দিয়েছিল।

১৬ জুলাই তাই কেবল একটি তারিখ নয়। এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক চেতনার এক আলোকস্তম্ভ। যে আলোর দিকে তাকিয়ে আগামী প্রজন্ম বুঝবে– কখনো কখনো একজন মানুষের সাহসই একটি জাতির ভাগ্য পরিবর্তনের সূচনা করে।

একই বিভাগের আরও খবর