শেয়ারবাজার

বাজার মূলধন বাড়লেও জিডিপি অনুপাতে আরও ছোট হচ্ছে শেয়ারবাজার

বিশেষ প্রতিনিধি প্রকাশ: সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬ ১ মিনিটে পড়া যাবে

দেশের শেয়ারবাজারে বাজার মূলধন, সূচক ও লেনদেন বেড়েছে। তবে অর্থনীতির সামগ্রিক আকারের তুলনায় বাজারের অবস্থান আরও দুর্বল হয়েছে। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ‘মার্কেট ক্যাপ টু জিডিপি’ অনুপাত কমে দাঁড়িয়েছে ১১ দশমিক ৪২ শতাংশে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ১১ দশমিক ৯৩ শতাংশ। অর্থাৎ বাজার মূলধন বাড়লেও জিডিপির তুলনায় শেয়ারবাজারের পরিধি আরও সংকুচিত হয়েছে।

ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে সরকারি বন্ডসহ সব ধরনের সিকিউরিটিজের মোট বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৯৮ হাজার ৬৯২ কোটি টাকা। এক বছর আগে যা ছিল ৬ লাখ ৬২ হাজার ২৭১ কোটি টাকা। অর্থাৎ বছরে বাজার মূলধন বেড়েছে ৩৬ হাজার ৪২১ কোটি টাকা। সরকারি বন্ড বাদ দিলে অন্যান্য সিকিউরিটিজের বাজার মূলধন বেড়েছে ৩৫ হাজার ৮৭৭ কোটি টাকা।

তবে জিডিপির প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে না পারায় বাজার মূলধনের অনুপাত কমে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি দেশের অর্থনীতির তুলনায় পুঁজিবাজারের দুর্বল অবস্থানেরই প্রতিফলন।

আরও পড়ুন

বিশ্বের উন্নত অর্থনীতিগুলোতে ‘মার্কেট ক্যাপ টু জিডিপি’ অনুপাত সাধারণত ১০০ থেকে ২০০ শতাংশের মধ্যে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রে এটি জিডিপির দ্বিগুণেরও বেশি। যুক্তরাজ্যে ৯১ থেকে ১২০ শতাংশ এবং ভারতে ১২৫ থেকে ১৩৭ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করে। সেখানে বাংলাদেশের হার মাত্র ১১ শতাংশের কিছু বেশি, যা দেশের পুঁজিবাজারের সীমিত পরিধিকেই নির্দেশ করে।

দুই বছর ধরে নতুন আইপিও নেই

দেশের বেসরকারি খাতের জন্য শেয়ারবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহ কার্যত স্থবির হয়ে আছে। ২০২৪ সালের জুনে সর্বশেষ Techno Drugs Limited আইপিওর মাধ্যমে ১০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। এরপর টানা দুই অর্থবছরে আর কোনো নতুন আইপিও অনুমোদন হয়নি।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্ত না হওয়ায় বিনিয়োগের সুযোগ কমছে, বাজারের গভীরতাও বাড়ছে না। বর্তমানে দেশে লক্ষাধিক নিবন্ধিত কোম্পানি থাকলেও চার শতাধিক কোম্পানিও শেয়ারবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহ করেনি।

ডিএসইর পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন বলেন, আইপিও নীতিমালার সংস্কার নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ব্যস্ত থাকায় নতুন কোম্পানি বাজারে আনার গতি কমেছে। ফলে বিনিয়োগের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়নি।

সূচক ও লেনদেনে ইতিবাচক অগ্রগতি

আইপিও না এলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শেয়ারবাজারের বিভিন্ন সূচকে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স বছরে ১৯ শতাংশের বেশি বেড়ে ৫ হাজার ৭৬৩ পয়েন্টে পৌঁছেছে। ডিএস-৩০ সূচক প্রায় ২০ শতাংশ এবং শরিয়াহভিত্তিক ডিএসইএস সূচক ১০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।

লেনদেনেও উল্লেখযোগ্য গতি এসেছে। বিদায়ী অর্থবছরে ডিএসইতে মোট ১ লাখ ৭২ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকার সিকিউরিটিজ লেনদেন হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫৬ শতাংশ বেশি।

একই সময়ে বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের লেনদেন ৪ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় এক হাজার কোটিরও বেশি বেশি। মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে লেনদেনও প্রায় ৭৯ শতাংশ বেড়ে ২৮ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

উন্নতির আড়ালে কাঠামোগত দুর্বলতা

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক উত্থান মূলত দুর্বল ও স্বল্পমানের কোম্পানির শেয়ারের ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে তালিকাভুক্ত ৩৬০টি কোম্পানির মধ্যে ১২৫টি ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে রয়েছে। এর মধ্যে ৬২টি কোম্পানির উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ বা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত।

সাইফুল ইসলাম বলেন, বিদ্যমান কোম্পানিগুলোর মানোন্নয়নের পাশাপাশি নতুন ও ভালো কোম্পানি বাজারে আনার বিকল্প নেই। তা না হলে বাজারের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব হবে না।

মো. আল-আমিন বলেন, ভালো মানের তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা কম হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের জন্য আকর্ষণীয় শেয়ারের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে বাজার শক্তিশালী করতে মানসম্পন্ন নতুন কোম্পানি যুক্ত করা জরুরি।

অন্যদিকে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন-এর মুখপাত্র আবুল কালাম জানান, আইপিও বিধিমালায় পরিবর্তন, আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন মানদণ্ড সংযোজন এবং কর-সুবিধার মাধ্যমে ভালো কোম্পানিকে বাজারে আনতে কাজ করছে কমিশন। তাদের আশা, শিগগিরই নতুন মানসম্পন্ন কোম্পানি তালিকাভুক্ত হলে দেশের পুঁজিবাজারের আকার ও গভীরতা আরও বাড়বে।

একই বিভাগের আরও খবর