অভিযুক্ত মোবারক হোসেন পাবনা জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের অফিস সহায়ক। তিনি ২০১৮ সাল থেকে ওই পদে কর্মরত রয়েছেন। তার বাড়ি পাবনার বেড়া উপজেলার রানীগ্রাম এলাকায়।
পাবনায় সমাজসেবা কার্যালয়ের কর্মচারীর বিরুদ্ধে ভুয়া ক্যান্সার রোগী দেখিয়ে সরকারি অনুদান আত্মসাতের অভিযোগ
ভুক্তভোগী শাকিল খান গত ২০ জুন রাজশাহী বিভাগীয় সমাজসেবা কার্যালয়ের পরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগের ভিত্তিতে বেড়া উপজেলার তৎকালীন সমাজসেবা কর্মকর্তা মোতালেব সরকার তদন্ত করে বিভাগীয় কার্যালয়ে প্রতিবেদন পাঠান। ওই প্রতিবেদনে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়, প্রতিবেশী হওয়ার সুযোগে ২০২২ সালে শাকিল খানের স্ত্রী লিপি খাতুনের জাতীয় পরিচয়পত্র ও ছবি সংগ্রহ করেন মোবারক হোসেন। পরে পারিবারিক প্রয়োজনে নতুন ব্যাংক হিসাব খুলতে গিয়ে তারা জানতে পারেন, রূপালী ব্যাংকের নগরবাড়ী ঘাট শাখায় লিপি খাতুনের নামে আগেই একটি হিসাব খোলা হয়েছে।
আরও পড়ুন
ব্যাংক হিসাবের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ওই হিসাবে সরকারি অনুদান হিসেবে ৫০ হাজার টাকা জমা হয়। দুই দিন পর ৭ সেপ্টেম্বর রূপালী ব্যাংকের পাবনা করপোরেট শাখা থেকে পুরো অর্থ উত্তোলন করা হয়। অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, ওই হিসাবের চেক বই অভিযুক্তের নিয়ন্ত্রণে ছিল।
পরে সমাজসেবা কার্যালয়ে খোঁজ নিয়ে শাকিল খান জানতে পারেন, তার সম্পূর্ণ সুস্থ স্ত্রীকে কাগজপত্রে ক্যান্সার রোগী দেখিয়ে সমাজসেবা অধিদপ্তরের বিশেষ অনুদান অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল।
শাকিল খান বলেন, "আমি লেখাপড়া জানি না। পরিচিত হওয়ার সুযোগে আমার স্ত্রীর জাতীয় পরিচয়পত্র ও ছবি নিয়েছিলেন মোবারক। পরে জানতে পারি, আমার সুস্থ স্ত্রীকে কাগজে-কলমে ক্যান্সার রোগী দেখিয়ে সরকারি অনুদানের টাকা তোলা হয়েছে।"
তদন্তকারী কর্মকর্তা মোতালেব সরকারের পাঠানো প্রতিবেদনে লিপি খাতুনের নামে অনুদানের অর্থ উত্তোলনের নথি সংযুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে এর আগেও অনুরূপ অভিযোগ পাওয়া গেছে।
স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, ক্যান্সার, কিডনি ও লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত রোগীদের সরকারি অনুদানের চেক পাইয়ে দেওয়ার নামে মোবারক হোসেন ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থ আদায় করতেন। এছাড়া সুস্থ ব্যক্তিদের নামে ভুয়া চিকিৎসা নথি তৈরি করে তাদের অজান্তে ব্যাংক হিসাব খুলে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে।
রানীগ্রামের বাসিন্দা কামরুল ইসলাম দাবি করেন, ২০২২ সালে তার ক্যান্সার আক্রান্ত বাবার জন্য বরাদ্দ হওয়া ৫০ হাজার টাকার অনুদান ছাড় করতে মোবারক হোসেন তার কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা নিয়েছিলেন।
একই গ্রামের হাসি আক্তার অভিযোগ করেন, তার ক্যান্সার আক্রান্ত স্বামীর জন্য অনুদান পাওয়ার আশ্বাস দিলেও তিনি কোনো অর্থ পাননি। অথচ তার দেবরের নামে সরকারি অনুদান উত্তোলন করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মোবারক হোসেন। তিনি বলেন, "আমি এসব কাজের সঙ্গে জড়িত নই। একটি কুচক্রী মহল আমাকে হয়রানি করার জন্য ষড়যন্ত্র করছে।" পরে এ বিষয়ে আর কোনো মন্তব্য না করে তিনি ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।
পাবনা জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক আব্দুল কাদের বলেন, চলতি অর্থবছরে অনুদান বিতরণ নিয়ে কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। জেলা প্রশাসক, সিভিল সার্জন ও সমাজসেবা বিভাগের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির যাচাইয়ের মাধ্যমে অনুদান অনুমোদন দেওয়া হয় এবং অর্থ সরাসরি উপকারভোগীর ব্যাংক হিসাবে পাঠানো হয়। তিনি বলেন, একজন অফিস সহায়কের পক্ষে এককভাবে অনুদান অনুমোদনের সুযোগ নেই।
তদন্ত প্রতিবেদন সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি কীভাবে গণমাধ্যমের কাছে এসেছে তা খতিয়ে দেখা হবে।
বেড়া উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের নবাগত কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম বলেন, তিনি সদ্য দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। প্রয়োজনীয় নথিপত্র পর্যালোচনা করে পরে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে পারবেন।
পাবনা জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম বলেন, অভিযোগটি তার নজরে এসেছে। সরকারি অনুদান বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।