গত ১৬ জুলাই ঢাকার স্বামীবাগে রথযাত্রার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্যের একপর্যায়ে প্রচণ্ড গরমে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। পরে চিকিৎসকের পরামর্শে বিশ্রামে যান। ঘটনাটি ছিল সাময়িক, কিন্তু সেটি যেন মনে করিয়ে দিল, ৭৮ বছরের এই মানুষটি প্রায় ছয় দশকের রাজনৈতিক পথচলার ভার কাঁধে নিয়ে এখনও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন।
দ্বিতীয় সারির রাজনীতিক থেকে রাষ্ট্রের দায়িত্বে, এবার ইতিহাস লেখার পালা
পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে এটি তার প্রথম দায়িত্ব। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেন তিনি। অথচ রাজনীতিতে তার যাত্রা শুরু ১৯৬৯ সালে। অর্থাৎ ৫৭ বছরের রাজনৈতিক জীবনের পর তিনি প্রথমবার রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রে পৌঁছেছেন।
জয়ের চেয়ে পরাজয় বেশি
মির্জা ফখরুলের নির্বাচনী ইতিহাস খুব একটা উজ্জ্বল নয়। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে পরাজয়, ২০০১ সালে জয়, ২০০৮ সালে আবার হার। ২০১৮ সালে নির্বাচিত হয়েও সংসদে শপথ নেননি। আর ২০২৬ সালে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে আবার সংসদে ফিরেছেন।
আরও পড়ুন
এই পরিসংখ্যান একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য সামনে আনে। বাংলাদেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন এমন একজন ব্যক্তি, যার রাজনৈতিক শক্তির ভিত্তি কখনোই ব্যক্তিগত ভোটের জোয়ার ছিল না। তার মূল শক্তি ছিল সংগঠন, ধৈর্য এবং দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকার সক্ষমতা।
এক পরিবারের দুই রাজনৈতিক ইতিহাস
মির্জা পরিবারের ইতিহাস নিজেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিবর্তনের একটি প্রতিচ্ছবি।
একদিকে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পৃক্ত পরিবারের সদস্য, অন্যদিকে জিয়াউর রহমান ও পরবর্তী বিএনপি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন মুসলিম লীগের রাজনীতিক এবং পরবর্তীতে মন্ত্রী।
কিন্তু মির্জা ফখরুল নিজে শুরু করেছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন আদর্শিক অবস্থান থেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালে ছাত্র ইউনিয়ন এবং পরে ভাসানীর ন্যাপের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। এরপর শিক্ষকতা, সরকারি চাকরি এবং শেষ পর্যন্ত বিএনপির রাজনীতিতে স্থায়ীভাবে যুক্ত হন।
এই দীর্ঘ আদর্শিক যাত্রার পূর্ণ ব্যাখ্যা তিনি কখনো প্রকাশ করেননি। ফলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এখনও অনালোকিত।
'ভারপ্রাপ্ত' পরিচয়েই কেটেছে সবচেয়ে কঠিন সময়
২০১১ সালে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর দলটির সবচেয়ে কঠিন সময়ে তিনি কার্যত সামনের সারির মুখ হয়ে ওঠেন।
খালেদা জিয়া কারাগারে, তারেক রহমান বিদেশে। আদালত, রাজপথ, সংবাদ সম্মেলন এবং রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া, সবখানেই দলের প্রতিনিধিত্ব করেছেন তিনি।
তার বিরুদ্ধে অসংখ্য রাজনৈতিক মামলা হয়েছে, একাধিকবার কারাবরণ করেছেন। তবে দুর্নীতির অভিযোগে তার বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো মামলা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এটি একটি ব্যতিক্রমী দিক বলেই বিবেচিত হতে পারে।
আলোচনায় থেকেও গবেষণার বাইরে
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের পরও তাকে নিয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো গবেষণা, পূর্ণাঙ্গ জীবনী বা একাডেমিক বিশ্লেষণ নেই।
এটি শুধু একজন রাজনীতিককে ঘিরে তথ্যের অভাব নয়। বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসচর্চার একটি সীমাবদ্ধতা। এখানে সাধারণত শীর্ষ নেতাদের নিয়ে ইতিহাস লেখা হয়, কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সংগঠন চালিয়ে যাওয়া দ্বিতীয় সারির নেতাদের ভূমিকা প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়।
শক্তি নাকি সীমাবদ্ধতা?
দলের ভেতরে তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের অভিযোগ, তিনি রাজপথের আগুনঝরা নেতা নন। তার ভাষণ সংযত, প্রতিপক্ষকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করেন না, উত্তেজনা তৈরির চেয়ে যুক্তি উপস্থাপনেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
বাংলাদেশের প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এগুলো অনেকের কাছে দুর্বলতা।
কিন্তু অন্য দিকও আছে। ব্যক্তিগত সততার ভাবমূর্তি, কূটনৈতিক মহলে গ্রহণযোগ্যতা, প্রতিপক্ষের প্রতিও সৌজন্য এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা তাকে আলাদা পরিচয় দিয়েছে।
এখন বিচার হবে কাজে
রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় টিকে থাকা অবশ্যই একটি অর্জন। কিন্তু ইতিহাস শেষ পর্যন্ত কাউকে মনে রাখে তার রেখে যাওয়া কাজের জন্য।
আজ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সামনে সেই সুযোগ রয়েছে।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব তার হাতে। জনগণের প্রত্যাশাও খুব বাস্তব। ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষ যেমন উন্নত হাসপাতাল, ভালো শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং কার্যকর স্থানীয় সরকার দেখতে চায়, তেমনি দেশের মানুষও দেখতে চায় এই দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা প্রশাসনিক সাফল্যে কতটা রূপ নেয়।
প্রায় ছয় দশকের রাজনৈতিক পথচলার পর তিনি এমন এক অবস্থানে দাঁড়িয়ে, যেখানে অতীতের সংগ্রাম নয়, ভবিষ্যতের কাজই তার পরিচয়ের সবচেয়ে বড় মাপকাঠি হয়ে উঠবে।
ইতিহাস তাকে দীর্ঘদিন দ্বিতীয় সারির একজন নির্ভরযোগ্য রাজনীতিক হিসেবে মনে রাখবে কি না, তা সময় বলবে। তবে মন্ত্রী হিসেবে তার এই অধ্যায়ই হয়তো নির্ধারণ করবে, তিনি শুধু একজন সংগঠক ছিলেন, নাকি একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবেও নিজের নাম লিখিয়ে যেতে পারবেন।