মতামত

ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের নতুন সমীকরণ

শরীফ প্রকাশ: বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২৬ ১ মিনিটে পড়া যাবে
বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা র-এর প্রধানের ঢাকা সফর এবং ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎকে এই সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ব্রিকস সম্মেলনকে ঘিরে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর সুযোগও তৈরি হয়েছে। তবে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে বেশ কিছু রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বাধা সামনে এসেছে।

এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক প্রেস ব্রিফিং। বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলে এমন অভিযোগ রয়েছে যে, ভারতের সমর্থন বা অনুমোদন নিয়েই এ ধরনের তৎপরতা হয়েছে। যদি এই অভিযোগ সত্য হয়ে থাকে, তাহলে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের কাছে বিষয়টি নিঃসন্দেহে স্পর্শকাতর। কারণ, নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় ঢাকা তার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোনো বিদেশি প্রভাবকে আগের মতো সহজভাবে নিতে চাইছে না।

আরেকটি বিষয় হলো ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর পাঠানো আমন্ত্রণপত্রের ভাষা। সেখানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সরাসরি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সম্বোধন না করে বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে উল্লেখ করার বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে মনে করা হচ্ছে। কূটনীতিতে শব্দের ব্যবহার অনেক সময় নিছক আনুষ্ঠানিকতা থাকে না; বরং এর মাধ্যমে একটি দেশের রাজনৈতিক অবস্থান বা বার্তাও প্রকাশ পেতে পারে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় পরিবর্তন সম্ভবত এখানেই—ঢাকা এখন কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না থেকে বহুমুখী সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাইছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীনসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা সেই নীতিরই অংশ হতে পারে। বিশেষ করে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত যোগাযোগ বাড়তে থাকলে ভারতের জন্য বিষয়টি নতুন করে ভাবার কারণ তৈরি হবে।

বিজ্ঞাপন

এই পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারত সফরে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন—এমন দাবি সামনে এসেছে। তবে সরাসরি আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যানের পরিবর্তে বাংলাদেশ দুটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত সামনে রেখেছে বলেও আলোচনা রয়েছে। প্রথমত, শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো এবং দ্বিতীয়ত, ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডের আসামি ফয়সালকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো।

বিজ্ঞাপন

দুই শর্তই রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হলে তার শাসনামলের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এবং গত ১৭ বছরের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে পারে। একইভাবে ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও সংশ্লিষ্টদের বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়টিও দুই দেশের সম্পর্কের জন্য সংবেদনশীল হয়ে উঠতে পারে।

তবে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—কোনো ব্যক্তি, সরকার বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে নির্ভরযোগ্য তদন্ত ও প্রমাণ প্রয়োজন। রাজনৈতিক বক্তব্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দাবি কিংবা বিভিন্ন মহলের অভিযোগকে যাচাই ছাড়া সত্য ধরে নেওয়া উচিত নয়।

বাংলাদেশের করপোরেট খাতে কর্মরত প্রায় ৩ হাজার অবৈধ ভারতীয় নাগরিককে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়টিও দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েনের উদাহরণ হিসেবে আলোচনায় এসেছে। যদি সংখ্যাটি ও প্রক্রিয়াটি সরকারি তথ্য দিয়ে নিশ্চিত হয়, তাহলে এটি অভিবাসন ও শ্রমবাজার ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে দেখার পাশাপাশি এর কূটনৈতিক প্রভাবও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে পুরোনো সমীকরণ দিয়ে নতুন বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করা কঠিন। বাংলাদেশ যদি সত্যিই বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে এবং ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে পারস্পরিক স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও সমতার ভিত্তিতে পুনর্গঠন করতে চায়, তাহলে সেটি বাংলাদেশের কূটনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হবে।

অন্যদিকে ভারতের জন্যও বাস্তবতা পরিষ্কার—বাংলাদেশকে আগের মতো কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সমীকরণের মধ্যে দেখার সুযোগ কমে এসেছে। সম্পর্ক টেকসই করতে হলে পারস্পরিক আস্থা, রাজনৈতিক স্বীকৃতি, সীমান্ত, বাণিজ্য, নিরাপত্তা এবং জনগণের স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে নতুন করে আস্থার জায়গা তৈরি করতে হবে।

শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক কারও জয়-পরাজয়ের বিষয় নয়। দুই দেশের জনগণের স্বার্থে একটি স্থিতিশীল, ভারসাম্যপূর্ণ ও পারস্পরিক সম্মানের সম্পর্কই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান পরিস্থিতি সেই নতুন সম্পর্ক তৈরির সুযোগও হতে পারে—যদি দুই দেশ অতীতের হিসাব-নিকাশের বাইরে গিয়ে বাস্তবতা ও পারস্পরিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়।

একই বিভাগের আরও খবর