দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে (এফসিসি) শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক বক্তব্য ও সংবাদ সম্মেলন করার সুযোগ দেওয়াকে বাংলাদেশ কোনোভাবেই সহজভাবে নেয়নি। পূর্বে যেখানে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল যে ভারতের মাটিকে বাংলাদেশবিরোধী কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না, সেখানে এমন একটি আয়োজন স্পষ্টতই দ্বিমুখী আচরণের নামান্তর। ঢাকা দীর্ঘদিন ধরে দিল্লির কাছ থেকে কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার প্রত্যাশা করে আসলেও, শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে ভারতের এই ভূমিকা ভারতের জন্যই একটি বড় কূটনৈতিক বুমেরাং হয়ে দাঁড়িয়েছে। দিল্লি হয়তো বরাবরের মতো একটি প্রথাগত প্রেস রিলিজের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার আশা করেছিল, কিন্তু ঢাকা থেকে আসা ‘হার্ড মেসেজ’ সেই সমীকরণ পুরোপুরি বদলে দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতীয় হাই কমিশনারের জরুরি সাক্ষাতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের শর্ত ও জটিলতাগুলো একেবারেই পরিষ্কার ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে। ঢাকার তরফ থেকে যে বার্তাগুলো ভারতের সামনে রাখা হয়েছে, তা মূলত বাংলাদেশের জনগণের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও আকাঙ্ক্ষারই প্রতিফলক:
-
মানবতাবিরোধী অপরাধীর রাজনৈতিক স্পেস বন্ধ ও প্রত্যাবর্তন: গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ দেওয়া বাংলাদেশের জনগণের অনুভূতিকে চরম অসম্মান করার শামিল। পূর্বে দেওয়া প্রতিশ্রুতির তোয়াক্কা না করে কীভাবে এমন সংবাদ সম্মেলন আয়োজিত হলো, ভারতীয় পক্ষ তার কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। একইসঙ্গে ২০১৩ সালের দ্বিপক্ষীয় বন্দি বিনিময় চুক্তি অনুযায়ী শেখ হাসিনাকে দ্রুত বাংলাদেশ সরকারের হাতে হস্তান্তর করার দাবিটি এখন অত্যন্ত জোরালো।
আরও পড়ুন
ভারতীয় মাটি থেকে অপতৎপরতা রোধ: ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে আওয়ামী লীগ যাতে কোনো ধরনের রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বা অপতৎপরতা চালাতে না পারে, সে বিষয়ে দিল্লিকে দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
সীমান্ত হত্যা ও পুশইন বন্ধ: সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিকদের ওপর হত্যা এবং অবৈধ পুশইন পুরোপুরি ও চিরতরে বন্ধ করতে হবে।
গঙ্গা পানি চুক্তি নবায়ন: দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত পানিবণ্টন সমস্যার সমাধানে, বিশেষ করে গঙ্গা পানি চুক্তির নবায়ন নিয়ে ভারতের অবস্থান ও মনোভাব দ্রুত পরিষ্কার করা জরুরি।
বিচারের মুখোমুখি করা: শহীদ ওসমান হাদীর অভিযুক্ত স্থানান্তরিত ‘হত্যাকারী’কে কালবিলম্ব না করে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করতে হবে।
এই মৌলিক ও স্পর্শকাতর ইস্যুগুলোতে মোদি সরকার যতক্ষণ না তাদের অবস্থান পরিষ্কার করছে এবং বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত দু দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হওয়া কঠিন। শুধু তা-ই নয়, এই অচলাবস্থা কাটানো না গেলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন ভারত সফরও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে—যা দিল্লির জন্য একটি বড় কূটনৈতিক ধাক্কা।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ এবং তৎপরবর্তী পরিস্থিতি দেখে স্পষ্ট যে, ঢাকার এই অনড় ও স্পষ্ট অবস্থান নয়াদিল্লির কূটনৈতিক শিবিরে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে। বার্তাগুলো নিয়ে হাই কমিশনারের তড়িঘড়ি নয়াদিল্লি ফিরে যাওয়ার চিত্রই প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ এখন আর আগের মতো নিষ্ক্রিয় কোনো প্রতিবেশী নয়। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক টিকে থাকে পারস্পরিক স্বার্থ, সম্মান এবং জনআকাঙ্ক্ষার ওপর ভিত্তি করে। দিল্লি যদি সত্যিই বাংলাদেশের সঙ্গে স্থিতিশীল ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়, তবে তাকে গতানুগতিক প্রেস রিলিজের মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে ঢাকার উত্থাপিত দাবিগুলোর দ্রুত ও বাস্তবসম্মত সমাধান নিশ্চিত করতে হবে।