মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণ, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা, ডিজিটাল বাণিজ্য ব্যবস্থা এবং উদ্যোক্তাবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে সংস্কার।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ১৮০ দিনে রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও নতুন বাজারে জোর
পোশাকনির্ভর রপ্তানি থেকে বহুমুখীকরণের উদ্যোগ
বাংলাদেশের রপ্তানি দীর্ঘদিন ধরে তৈরি পোশাকনির্ভর হলেও চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল, ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষিপ্রক্রিয়াজাত পণ্য ও পাটজাত পণ্যকে সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে সামনে আনা হচ্ছে।
বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বের ২০২টি গন্তব্যে ৮১২ ধরনের পণ্য রপ্তানি করছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নতুন বাজার তৈরি ও বিদ্যমান বাজার সম্প্রসারণে ৪৩টি পণ্য ও সেবা খাতে ৩ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত নগদ সহায়তা ও প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন
চামড়া ও অ্যাগ্রো-প্রসেসিং খাতে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ এবং ওষুধ ও আইটি খাতে ৬ শতাংশ পর্যন্ত সহায়তা রয়েছে। এ ছাড়া ২০২৬ সালের জন্য ‘পেপার অ্যান্ড প্যাকেজিং’ শিল্পকে বর্ষপণ্য ঘোষণা করে আন্তর্জাতিক বাজারে এ খাতের সক্ষমতা বাড়াতে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
‘এক গ্রাম এক পণ্য’ উদ্যোগের আওতায় নির্বাচিত ১৪টি পণ্য এবং বাংলাদেশের ৬২টি জিআই পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার সম্ভাবনাও যাচাই করা হচ্ছে।
অর্থনৈতিক কূটনীতিতে গুরুত্ব
এলডিসি থেকে উত্তরণের পর শুল্ক সুবিধা ধরে রাখা এবং নতুন বাণিজ্য অংশীদার তৈরি করাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে সরকার। এ কারণে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য কূটনীতিতে গুরুত্ব বাড়ানো হয়েছে।
জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (EPA) এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (CEPA) স্বাক্ষরের বিষয়টি এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছে সরকার।
এ ছাড়া দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণে আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে আসিয়ান, বিমসটেক, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব নিয়ে সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নে ২০২৬-পরবর্তী সময়ে জিএসপি প্লাস সুবিধা নিশ্চিত করা এবং ওষুধ শিল্পের পেটেন্ট সুবিধা ২০৩৩ সাল পর্যন্ত বহাল রাখার বিষয়েও কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে।
বাণিজ্য সচিব আতাউর রহমান খান বলেন, এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হবে শুল্ক সুবিধা ধরে রাখা এবং নতুন বাণিজ্য অংশীদারত্ব তৈরি করা। এ কারণে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য কূটনীতিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রায় ৫০ আন্তর্জাতিক মেলায় অংশ নেবে বাংলাদেশ
রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণে চলতি বছর বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ বাজারগুলোতে প্রায় ৫০টি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)।
এসব মেলায় তৈরি পোশাকের পাশাপাশি চামড়া, কৃষিপণ্য, হস্তশিল্প, আইসিটি, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ও পাটজাত পণ্যসহ সম্ভাবনাময় খাতের উদ্যোক্তারা অংশ নেবেন। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এবং নতুন রপ্তানি আদেশ পাওয়াই এসব অংশগ্রহণের অন্যতম লক্ষ্য।
আমদানি নীতিতে পরিবর্তনের উদ্যোগ
এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী পরিস্থিতি বিবেচনায় ‘আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬-২০২৯’ প্রণয়নের কাজ চলছে। এতে বাণিজ্য সহজীকরণ, দেশীয় শিল্পের সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
অপ্রয়োজনীয় ও বিলাসী পণ্যের আমদানি নিরুৎসাহিত করার পাশাপাশি শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও আধুনিক প্রযুক্তি আমদানির প্রক্রিয়া সহজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
টিসিবিতে ডিজিটালাইজেশন
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহ কার্যক্রম আরও স্বচ্ছ করতে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)-এর কার্যক্রম ডিজিটালাইজেশনের আওতায় আনা হচ্ছে।
স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড ও বায়োমেট্রিক তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত নিম্নআয়ের মানুষের কাছে ন্যায্যমূল্যে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমিয়ে বিতরণ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনার লক্ষ্য রয়েছে।
অর্থনীতিতে এখনো বড় চ্যালেঞ্জ
তবে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও অর্থনীতির পুঞ্জীভূত সমস্যাগুলো এখনো পুরোপুরি কাটেনি বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সরকার বেশ কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ নিয়েছে। তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের স্থবিরতা, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির নিম্নগতি, কর্মসংস্থান সংকট এবং ব্যাংকিং খাতের সমস্যাগুলো এখনো রয়েছে।
তিনি বলেন, বিশেষ করে জ্বালানি পরিস্থিতি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন বাধা তৈরি করেছে। সরকারের নেওয়া উদ্যোগগুলোর বাস্তব প্রভাব অর্থনীতিতে কতটা পড়ে, তা মূল্যায়নের জন্য আরও কিছু সময় প্রয়োজন।
ব্যবসায়ী মহলের পক্ষ থেকেও গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটকে বিনিয়োগের অন্যতম বাধা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব সমস্যা সমাধান হলে ব্যবসার পরিবেশ আরও উন্নত হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সব মিলিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রথম ১৮০ দিনে রপ্তানি বহুমুখীকরণ, নতুন বাজার সৃষ্টি, অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং বাণিজ্য ব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশনে একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের বাস্তব ফলাফল নির্ভর করবে বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে এর কার্যকর প্রভাব কতটা পড়ে তার ওপর।