রাজনীতি

ছয় মাসে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের ৩৮ নেতাকর্মী নিহত, অধিকাংশ ঘটনায় আধিপত্য ও দখল-বাণিজ্যের যোগ

ঢাকা ম্যাগাজিন ডেস্ক প্রকাশ: শনিবার, ০১ আগস্ট ২০২৬ ১ মিনিটে পড়া যাবে

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশে মোট এক হাজার ৯১টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। অন্যদিকে মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, ফেব্রুয়ারি থেকে ২৮ জুলাই পর্যন্ত নিহত ৩৮ নেতাকর্মীর মধ্যে বিএনপির ২১ জন, যুবদলের ৮ জন, ছাত্রদলের ২ জন, শ্রমিক দলের ২ জন, কৃষক দলের ২ জন, স্বেচ্ছাসেবক দলের ২ জন এবং তাঁতীদলের একজন রয়েছেন।

সর্বশেষ ২৪ জুলাই রাতে রাজধানীর কাফরুলে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন যুবদলের কর্মী মো. ইউসুফ আলী পারভেজ। ওই হামলায় আরও একজন যুবদল কর্মী ও এক সবজি বিক্রেতা আহত হন। পুলিশের তদন্তে জানা গেছে, কাফরুল থানা যুবদলের সদস্য সচিব হাফিজুল ইসলাম বাবুকে হত্যার উদ্দেশ্যে ২৫ লাখ টাকার চুক্তিতে ঝিনাইদহ ও মাগুরা থেকে ভাড়াটে অস্ত্রধারী আনা হয়েছিল। তবে লক্ষ্যভ্রষ্ট গুলিতে নিহত হন পারভেজ। তদন্তে ময়লা ব্যবস্থাপনা, ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ, ব্যবসায়িক স্বার্থ ও টিনশেড ঘরের দখল নিয়ে বিরোধের তথ্য উঠে এসেছে। এ ঘটনায় ভাড়াটে শ্যুটারসহ আটজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগ।

এর আগে ২১ জুলাই রাজধানীর সবুজবাগে ওয়ার্ড বিএনপির কর্মী ইব্রাহিম পলাশকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। হামলাকারীরা তার দুই হাতের কবজি বিচ্ছিন্ন করে দেয়। স্থানীয়দের দাবি, পূর্বশত্রুতার জেরে যুবদলের কয়েকজন নেতাকর্মীসহ ১০ থেকে ১৫ জন ওই হামলায় অংশ নেয়।

আরও পড়ুন

১৫ জুলাই কিশোরগঞ্জের মিঠামইনে উপজেলা বিএনপির পদ স্থগিত হওয়া সভাপতি জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীরকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তদন্তে স্থানীয় ছাত্রদলের এক নেতার সঙ্গে বিরোধের জেরে ভাড়াটে অপরাধীদের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।

এর আগে ৮ জুন রাজধানীর মৌচাক এলাকায় রমনা থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক আহ্বায়ক বিল্লাল হোসেন ছুরিকাঘাতে নিহত হন। পুলিশের ধারণা, ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদাবাজির বিরোধ থেকেই এ হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত।

এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে বিএনপির কর্মী রাজু আহম্মেদ, চট্টগ্রামের রাউজানে যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরী, খুলনায় বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলাম, ময়মনসিংহে বিএনপিকর্মী রানা মিয়া এবং বাগেরহাটে কৃষক দলের সভাপতি বাদল মোড়ল পৃথক ঘটনায় নিহত হয়েছেন।

মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে ৬১০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছেন ৩৬ জন এবং আহত হয়েছেন চার হাজার ৭৮ জন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব ঘটনার মধ্যে ৫৭৩টি ছিল বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধ অথবা বিএনপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে। নিহতদের মধ্যে বিএনপির ২৮ জন, জামায়াতের চারজন, আওয়ামী লীগের একজন এবং অন্যান্য দলের তিনজন রয়েছেন। একই সময়ে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ১৯৪টি ঘটনায় এক হাজার ৫৮৫ জন আহত এবং ২৪ জন নিহত হন। বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষে সাতজন এবং বিএনপি-আওয়ামী লীগ সংঘর্ষে তিনজন নিহত হওয়ার তথ্যও উঠে এসেছে।

নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতার ৩৯৫টি ঘটনায় আহত হন দুই হাজার ৫৭৩ জন এবং নিহত হন ১২ জন। একই সময়ে ৬০০টির বেশি বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও নির্বাচনী কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে।

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী দাবি করেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় দলের নেতাকর্মীরা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হামলার শিকার হচ্ছেন। তিনি এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, প্রতিটি হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। তার মতে, অধিকাংশ ঘটনার পেছনে স্থানীয় আধিপত্য, ফুটপাত, ময়লা-বাণিজ্য, দখল ও ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের বিরোধ কাজ করছে এবং অনেক ক্ষেত্রে বাইরের জেলা থেকে ভাড়াটে শ্যুটার আনা হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধবিজ্ঞানী তৌহিদুল হক মনে করেন, ফুটপাত, ময়লা-বাণিজ্য, পরিবহন ও দখল ব্যবসার মতো বেআইনি অর্থনৈতিক খাতের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করেই রাজনৈতিক সহিংসতা বাড়ছে। তিনি বলেন, এসব অবৈধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের নিয়ন্ত্রণ বন্ধ, আইনের শাসন নিশ্চিত এবং প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা না গেলে রাজনৈতিক সহিংসতা আরও বাড়তে পারে।

 
 
 
 

একই বিভাগের আরও খবর