মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত সর্বশেষ মূল্যায়নে মুডিস জানিয়েছে, নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক রূপান্তর এবং নতুন সরকারের প্রতি সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসমর্থনের কারণে সংস্কার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি কমেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে ধারাবাহিক প্রতিশ্রুতি এবং অন্যান্য সংস্থার সহযোগিতাও অর্থায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কমায় দেশের ঋণমানের পূর্বাভাস ‘স্থিতিশীল’ করল মুডিস
এর আগে ২০২৫ সালের মার্চে বাংলাদেশের ঋণমান ‘বি-ওয়ান’ থেকে কমিয়ে ‘বি-টু’ করে মুডিস। একই সঙ্গে পূর্বাভাস ‘স্থিতিশীল’ থেকে ‘নেতিবাচক’ করা হয়েছিল। এবার দীর্ঘমেয়াদি ইস্যুয়ার ও সিনিয়র আনসিকিউরড রেটিং ‘বি-টু’ এবং স্বল্পমেয়াদি ইস্যুয়ার রেটিং ‘নট প্রাইম’ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
ঋণমানের পূর্বাভাস স্থিতিশীল হওয়ায় বিদেশি ব্যাংকগুলো বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর জন্য ঋণসীমা বাড়াতে পারে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এতে আমদানি অর্থায়ন সহজ হওয়ার পাশাপাশি আমদানি কার্যক্রম বাড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহিত রহমান বলেন, মুডিসের রেটিং বড় ঋণদাতারা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। রেটিং উন্নত হওয়ায় বিদেশি ব্যাংকগুলো ডলারের ঋণসীমা বাড়াতে শুরু করলে ঋণপত্র খোলা সহজ হতে পারে।
আরও পড়ুন
মুডিসের তথ্য অনুযায়ী, বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে রেকর্ড প্রবাসী আয়, নমনীয় বিনিময় হার এবং বিনিময় হারকে বাজারভিত্তিক করার মতো সংস্কারের ফলে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে প্রায় ৩২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এ রিজার্ভ দিয়ে চার মাসের বেশি আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। ২০২৪ সালে রিজার্ভ ছিল ২১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের পূর্বাভাসও দিয়েছে সংস্থাটি। মুডিসের হিসাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল সাড়ে ৩ শতাংশ, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪ দশমিক ১ শতাংশ এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা ৪ দশমিক ৩ শতাংশ হতে পারে। শিল্প খাতে কর্মচাঞ্চল্য ও বিনিয়োগ স্বাভাবিক হলে ২০২৭-২৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। তবে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের আশপাশে থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
বড় ঝুঁকি ব্যাংক খাত
অর্থনৈতিক পূর্বাভাসে উন্নতি হলেও ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতার কারণে বাংলাদেশের রেটিং ‘বি-টু’তেই রেখেছে মুডিস। সংস্থাটির হিসাবে, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৩২ দশমিক ৮ শতাংশ।
মুডিস বলেছে, ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি পূরণ করে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ফেরাতে জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশের সমপরিমাণ অর্থ পুনর্মূলধনীকরণে প্রয়োজন হতে পারে। সীমিত রাজস্ব আয়ের কারণে এটি সরকারের ওপর বড় চাপ তৈরি করতে পারে। তবে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত বছরে ১২ শতাংশ আমানত বৃদ্ধির তথ্য উল্লেখ করে সংস্থাটি বলেছে, ব্যাংকিং খাতের প্রধান সমস্যা তারল্য নয়; বরং খেলাপি ঋণের কারণে তৈরি হওয়া মূলধনের সংকট।
রাজস্ব ঘাটতিও বড় চ্যালেঞ্জ
মুডিসের মতে, জিডিপির অনুপাতে বাংলাদেশ বিশ্বের সর্বনিম্ন রাজস্ব সংগ্রহকারী দেশগুলোর অন্যতম। ফলে সরকারের আর্থিক নমনীয়তা সীমিত। সরকারের মোট রাজস্বের প্রায় ৩০ শতাংশ ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হয়। তবে জিডিপির তুলনায় সরকারি ঋণ এখনো সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে।
ঝুঁকির বিষয়ে মুডিস আরও জানিয়েছে, এলএনজি টার্মিনাল-বিভ্রাটের কারণে বিদ্যুৎ ও শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় দেশের বিদ্যুৎ খাতের দুর্বলতা স্পষ্ট হয়েছে। এ ছাড়া স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বের হয়ে এলে রপ্তানি সক্ষমতা এবং নমনীয় শর্তে অর্থায়নের ক্ষেত্রে চাপ তৈরি হতে পারে।