সিরাজগঞ্জ জেলা বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক খোরশেদ আলম মিন্টু জানান, ১৯৯৭ সালের নভেম্বরে মোজাফফর হোসেন নিজ বাড়িতে অবস্থান করছেন—এমন তথ্য পেয়ে বিএনপির নেতাকর্মীরা সেখানে যান। তবে তার চেহারা সম্পর্কে নিশ্চিত ধারণা না থাকায় তাকে শনাক্ত করতে পারেননি।
প্রকাশ্যেই ছিলেন মোজাফফর, সিরাজগঞ্জে দেওয়া হয় সংবর্ধনা
মিন্টুর ভাষ্য, তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছে একজন ব্যক্তির কাছেই মোজাফফরের বাড়ির ঠিকানা জানতে চান। পরে জানা যায়, যিনি পথ দেখিয়েছিলেন তিনিই ছিলেন মোজাফফর হোসেন। এ সুযোগে তিনি সেখান থেকে সরে যান। পরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে।
২০১৯ সালে সংবর্ধনা
২০১৯ সালের ৩১ মার্চ সিরাজগঞ্জ পৌরসভার ১৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে শহীদ এম মনসুর আলী মিলনায়তনে আয়োজিত গুণীজন সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে মোজাফফর হোসেনকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন তৎকালীন পৌর মেয়র সৈয়দ আবদুর রউফ মুক্তা।
আরও পড়ুন
অনুষ্ঠান উপলক্ষে প্রকাশিত স্মারকে মোজাফফরকে মুক্তিযোদ্ধা ও অবসরপ্রাপ্ত মেজর হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়। ওই প্রকাশনায় তার নাকের নিচে থাকা একটি জন্মচিহ্নও স্পষ্টভাবে দেখা যায়। পরে গ্রেপ্তারের সময় একই জন্মচিহ্ন তার পরিচয় নিশ্চিত করতে সহায়ক হয়েছে বলে জানিয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ।
স্থানীয় কয়েকজন প্রবীণ সাংবাদিকের দাবি, সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের পর মোজাফফর স্থানীয় প্রেস ক্লাবেও যান এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে সময় কাটান। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, জিয়া হত্যা মামলার আসামি হলেও সিরাজগঞ্জে তার প্রকাশ্য উপস্থিতি স্থানীয়ভাবে অনেকেরই জানা ছিল।
মুক্তিযুদ্ধ থেকে রক্ষীবাহিনী
সিরাজগঞ্জের বাসিন্দা মোজাফফর হোসেন ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্সের (বিএলএফ) একজন কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে ১৯৭২ সালে গঠিত জাতীয় রক্ষীবাহিনীর প্রথম ব্যাচে যোগ দেন এবং পরবর্তীতে সেনাবাহিনীতে মেজর পদে অন্তর্ভুক্ত হন।
মুক্তিযোদ্ধাদের সরকারি তালিকায়ও তার নাম রয়েছে।
মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর ফোনে মিলল সূত্র
গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যমতে, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার সাবেক লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর মোবাইল ফোনের ফরেনসিক বিশ্লেষণ থেকেই মোজাফফরের অবস্থান সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়।
তদন্তে 'জন ডো' নামে সংরক্ষিত একটি নম্বরের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের তথ্য পাওয়া যায়। পরবর্তীতে সেটি মোজাফফরের বলে নিশ্চিত হয় তদন্তকারীরা। এরপর নজরদারি চালিয়ে গত বুধবার রাতে রাজধানীর বনানী ডিওএইচএস এলাকার একটি বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পরে তাকে সামরিক কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
জিয়া হত্যা মামলার অন্যতম পলাতক আসামি
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে এক সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। এ ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় মোজাফফর হোসেন ছিলেন অন্যতম আসামি।
বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থ ও প্রকাশিত তথ্যে উল্লেখ রয়েছে, জিয়া হত্যাকাণ্ডের সময় এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে মোজাফফরের উপস্থিতি ছিল। ঘটনার পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান এবং দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় পলাতক ছিলেন।
সম্প্রতি তাকে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে দেশের অন্যতম আলোচিত এই মামলার দীর্ঘদিনের এক পলাতক আসামিকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে।