শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের ব্যাংককের কুইন সিরিকিত ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার সাইড ইভেন্টে ‘এআই অ্যান্ড দ্য গ্লোবাল ইকোনমি: ফ্রম রিস্কস টু অপরচুনিটি’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় এসব বিষয় উঠে আসে। এতে নীতিনির্ধারক, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিনিধি ও প্রযুক্তি খাতের নেতারা অংশ নেন।
আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেন, এআই ব্যবহারে ব্যক্তিগত পর্যায়ে কাজের দক্ষতা বাড়ানোর কিছু অগ্রগতি দেখা গেলেও সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর রূপান্তরমূলক প্রভাব এখনো স্পষ্ট নয়। নতুন প্রযুক্তির বিস্তার, কর্মপদ্ধতির পরিবর্তন এবং বিদ্যমান ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় করতে সময় লাগে। তাই এআই থেকে দ্রুত বড় ধরনের সুফল পাওয়ার প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নাও হতে পারে।
আলোচনায় ব্যাংক অব কানাডার গভর্নর টিফ ম্যাকলেম প্রযুক্তির উত্থান-পতনের উদাহরণ হিসেবে নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে ইন্টারনেট কোম্পানিগুলোকে ঘিরে তৈরি হওয়া ডটকম বুদ্বুদের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, সে সময় অনেক প্রতিষ্ঠান টিকে থাকতে পারেনি এবং বিনিয়োগকারীরা লোকসানে পড়েছিলেন। তবে দীর্ঘ মেয়াদে ইন্টারনেট প্রযুক্তি উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে অর্থনীতি ও সমাজে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। তাঁর মতে, কোনো প্রযুক্তির সম্ভাবনা মূল্যায়নে পৃথক প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর প্রভাবও বিবেচনা করা জরুরি।
এআই প্রযুক্তির দ্রুত উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন অ্যানথ্রপিকের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও নীতিবিষয়ক প্রধান জ্যাক ক্লার্ক। তিনি বলেন, এআই কেবল তথ্য বা পরামর্শ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এজেন্টভিত্তিক প্রযুক্তির মাধ্যমে নির্দিষ্ট কাজের বিভিন্ন ধাপও সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে। অ্যানথ্রপিকের ‘ক্লড কোড’-এর মতো প্রযুক্তি কর্মীদের কাজের গতি বাড়াতে এবং জটিল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সহায়তা করতে পারে।
তবে এআইয়ের বিস্তারের সঙ্গে শ্রমবাজারে পরিবর্তন, বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের হাতে সুবিধা কেন্দ্রীভূত হওয়া, সাইবার হামলা ও আর্থিক ঝুঁকিও বাড়তে পারে। প্রযুক্তির ভুল ফলাফল যাচাই, তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে মানুষের তদারকি বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তাও আলোচনায় গুরুত্ব পায়।
বাংলাদেশের জন্যও এআই নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তৈরি পোশাকশিল্পে উৎপাদন পরিকল্পনা ও পণ্যের মান যাচাই, ব্যাংকিংয়ে জালিয়াতি শনাক্তকরণ, কৃষিতে ফসল ও আবহাওয়ার তথ্য বিশ্লেষণ এবং স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সরকারি সেবায় দক্ষতা বাড়াতে প্রযুক্তিটি কাজে লাগানো সম্ভব। তবে এসব ক্ষেত্রে সুফল পেতে নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল অবকাঠামো, দক্ষ জনবল, তথ্যের সুরক্ষা এবং উপযুক্ত নীতিমালা প্রয়োজন।
এআইয়ের কারণে শ্রমবাজারে সম্ভাব্য পরিবর্তন মোকাবিলায় কর্মীদের নতুন দক্ষতা অর্জন ও পুনঃপ্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরিও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে এ প্রযুক্তির সুবিধা পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে তাদের ব্যবধান বাড়তে পারে।
আলোচনার মূল বার্তা হলো, শুধু এআই প্রযুক্তি গ্রহণ করলেই উৎপাদনশীলতা বাড়বে না। প্রতিষ্ঠান ও কর্মীদের কাজের সঙ্গে প্রযুক্তির কার্যকর সমন্বয়, বাস্তবসম্মত প্রত্যাশা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির মাধ্যমে এর সুফল নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রযুক্তির ঝুঁকি মোকাবিলা এবং এর সুবিধা সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।




