শনিবার (১৫ আগস্ট) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে তিনি এ প্রশ্ন করেন।
শফিকুল আলম তাঁর পোস্টে লেখেন, 'কোন শেখ মুজিবকে নিয়ে কেউ কেউ শোক করে? আবার কোন শেখ মুজিবের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আমাদের পূর্বপুরুষরা প্রার্থনা করেছিল? এই দুইজন কি একই মুজিব? এটা এক জটিল ডিলেমা। একাত্তরে যে নায়ক, পঁচাত্তরে সে খলনায়ক।'
তিনি বলেন, 'মুজিব এমনই বিপরীত গুণে ঠাসা চরিত্র। একাত্তরের ৭ মার্চ পর্যন্ত যে মুজিব—ইতিহাসে তাঁর ভূমিকা এক রকম। আর ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের শেখ মুজিব আরেক রকম। এই দুই ভূমিকাকে নির্মোহভাবে না দেখলে আমরা আমাদের ফল্টলাইনগুলো ঠিকভাবে সমাধান করতে পারব না।'
শফিকুল আলম স্বীকার করেন, '১৫ আগস্টে নিঃসন্দেহে ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল ৩২ নম্বরে। একটি ছোট্ট শিশুকেও বাঁচতে দেওয়া হয়নি সেই রাতে। গোটা পরিবারকে হত্যা করা হয়েছে। যে কোনো বিবেকবান মানুষ এমনকি সবচেয়ে বড় অপরাধীকেও এভাবে পরিবারসহ হত্যা করা হলে ব্যথিত হবেন।'
তবে তিনি প্রশ্ন তোলেন, 'ইতিহাসের ক্যালেন্ডারে তো ৭ মার্চের পরের দিনই ১৫ আগস্ট না। মাঝে তো বহু ঘটনা ঘটেছে—রক্ষীবাহিনীর হাতে হাজার হাজার মানুষ খুন হয়েছে, লুটপাট ও অব্যবস্থাপনার কারণে ভয়ংকর দুর্ভিক্ষ হয়েছে যাতে প্রায় ১৫ লাখ লোক মারা গেছে বলে ইতিহাসবিদরা বলছেন, গণতন্ত্র হত্যা করা হয়েছে, দুঃশাসনের হাত থেকে মুক্তির সব রাস্তা বন্ধ করা হয়েছে। এটা মাথায় না রাখলে আমরা বুঝতে পারব না কেন দেশের মানুষ সেই মৃত্যুতে শোকাহত হলো না।'
তিনি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর লাখ লাখ মানুষের শোকের কথা উল্লেখ করে বলেন, 'সমস্যা হলো, শেখ মুজিবের ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল—এই সময়টিকে পত্রিকা-ইতিহাস-সাংস্কৃতিক বর্ণনার মাধ্যমে এমনভাবে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে যে এখন আর মনে করা কঠিন আমাদের পূর্বপুরুষেরা কেন তার মৃত্যুতে শোকাহত হননি। ১৯৯০-এর পরে মূলধারার পত্রিকায় এই সময়টি নিয়ে তেমন আলোচনা মনে পড়ে না। এটা মুজিবকে হোয়াইটওয়াশ করারই একটি প্রকল্প।'

তিনি বলেন, 'ঐ সময়ের বাস্তবতায় যদি 'বঙ্গবন্ধু মরে নাই' শোনা গেলে, আমার আপনার মতো আরও হাজার হাজার মানুষ মারা যেতো, বিচারটাও হতো না। কারণ দেশে তখন শেখ মুজিবই ছিলেন আইন।' তিনি হাসিনার আমলের সঙ্গে তুলনা টেনে বলেন, 'এটা বুঝতে সুবিধা হবে হাসিনার আমলে যেভাবে হাসিনাই আইন ছিল সেটা মাথায় রাখলে।'
শফিকুল আলম বলেন, 'জুলাই প্রায় পুরোটা ক্যামেরার সামনে ঘটে যাওয়া বিপ্লব। জুলাই-পরবর্তী ডিজিটাল আর্কাইভিং, জুলাই জাদুঘর এবং ১৬ বছরের দুঃশাসন নিয়ে তৈরি অসংখ্য ডকুমেন্টারির কারণে মিডিয়া চাইলেও আর হাসিনার অপরাধ ধুয়ে মুছে ফেলতে পারবে না। নাহলে হয়তো আজ থেকে দশ বছর পরে কেউ গান লিখতো—'যদি রাত পোহালে শোনা যেতো, শেখ হাসিনা পালায় নাই'।'
তিনি বলেন, 'আমাদের সামষ্টিক নিরাময়ের জন্য প্রয়োজন ৭ মার্চ-পূর্ববর্তী এবং ১৯৭২-পরবর্তী মুজিবের নির্মোহ মূল্যায়ন। এটা যদি আমরা করে থাকতাম, তাহলে শেখ মুজিবকে আইকন বানিয়ে হাসিনা আমাদের হাজার হাজার ভাই-বোনকে খুন-গুম করতে পারতো না।'
পোস্টের শেষে তিনি লেখেন, 'সপরিবারে খুন হওয়া শেখ মুজিবের জন্য শোক, ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালে খুন হওয়া সকল বাংলাদেশীর জন্য শোক।'





