সচিবালয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নিজ দপ্তরে গণমাধ্যমকে সাক্ষাৎকালে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিগত সরকারের সময় দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, দুর্নীতি এবং অব্যবস্থাপনার কারণে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই এ খাতকে পুনর্গঠনের জন্য আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, গত ১৮০ দিনে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিরলসভাবে কাজ করেছেন এবং ভবিষ্যতের জন্য টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। যেখানে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে, সেখানেই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং মন্ত্রণালয়ে কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতির সুযোগ রাখা হবে না বলে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে উৎপাদনের শুরু থেকেই গুণগত মান নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মাটির গুণগত মান পরীক্ষা, নিরাপদ পশুখাদ্য নিশ্চিতকরণ এবং উৎপাদন ব্যবস্থার আধুনিকায়নের মাধ্যমে নিরাপদ প্রাণিজ খাদ্য ভোক্তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, দেশের খামারিদের সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময় করা হচ্ছে এবং বিভিন্ন পর্যায়ে উৎপাদনকারী, উদ্যোক্তা ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় এবং ভোক্তারা নিরাপদ ও রোগমুক্ত প্রাণিজ খাদ্য পান।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিনের অবহেলায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক গোয়াল ফার্ম প্রায় বিলুপ্তির পথে। সরকার সেটিকে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নিয়েছে এবং ইতোমধ্যে ফার্মটি পরিদর্শন করে গবাদিপশুর উৎপাদন বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, পবিত্র রমজান মাসে সাধারণ মানুষের জন্য ন্যায্যমূল্যে প্রোটিনজাতীয় খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিতে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। রাজধানীর ৩৬টি স্থানে এবং দেশের বিভিন্ন জেলায় ভ্রাম্যমাণ বিক্রয় কেন্দ্রের মাধ্যমে মাংস, দুধ, ডিমসহ বিভিন্ন প্রাণিজ পণ্য ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করা হয়েছে, যা ব্যাপক সাড়া পেয়েছে।
গত কোরবানির সময়ে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এবারের কোরবানিতে দেশীয় গবাদিপশুর ব্যবহার নিশ্চিত করতে সীমান্ত দিয়ে অবৈধ পশু প্রবেশ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। ফলে দেশীয় খামারিরা ন্যায্যমূল্য পেয়েছেন এবং ক্রেতারাও সহনীয় মূল্যে কোরবানির পশু কিনতে সক্ষম হয়েছেন। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৯৮ লাখ দেশীয় গবাদিপশু কোরবানি হয়েছে।
প্রাণিসম্পদ গবেষণায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই) সম্প্রতি দুটি গুরুত্বপূর্ণ ভ্যাকসিন উদ্ভাবন করেছে, যা ইতোমধ্যে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। আগে এসব ভ্যাকসিন বিদেশ থেকে আমদানি করতে হতো; এখন দেশেই উৎপাদন সম্ভব হওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি দ্রুত ভ্যাকসিন সরবরাহ নিশ্চিত করা যাবে।
জাতীয় চিড়িয়াখানার আধুনিকায়ন প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, চিড়িয়াখানাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। পরিবেশ, ব্যবস্থাপনা ও প্রাণী সংগ্রহে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে এবং দর্শনার্থীর সংখ্যা আগের তুলনায় বহুগুণ বেড়েছে। সম্প্রতি চারটি নতুন প্রাণী সংযোজন করা হয়েছে এবং রয়েল বেঙ্গল টাইগারের তিনটি শাবক জন্ম নিয়েছে। রাজশাহী, চট্টগ্রাম, বগুড়া ও বরিশালে নতুন চিড়িয়াখানা এবং নতুন সাফারি পার্ক স্থাপনের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
প্রাণিসম্পদ খাতকে রপ্তানিমুখী শিল্পে পরিণত করতে আধুনিক মিট প্রসেসিং সেন্টার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি জানান, ইতোমধ্যে ১৩টি প্রসেসিং সেন্টার উদ্বোধন করা হয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি জেলায় এ ধরনের কেন্দ্র স্থাপন করা হবে।
তিনি আরও জানান, অস্ট্রেলিয়া থেকে উন্নত জাতের উচ্চ ফলনশীল পশুখাদ্য ঘাস আনা হয়েছে এবং প্রায় ৮৫০ জন খামারিকে এর চাষাবাদে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এই ঘাস ব্যবহারের ফলে পশুর খাদ্য ব্যয় কমবে, দুধ ও মাংস উৎপাদন বাড়বে এবং আমদানিনির্ভর পশুখাদ্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমবে।
মৎস্য খাতের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে জাটকা সংরক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে এবং নিষেধাজ্ঞাকালে ক্ষতিগ্রস্ত জেলেদের সহায়তায় ২৪ কোটির বেশি টাকার বিভিন্ন সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতকে আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও টেকসই খাতে পরিণত করতে সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা, খামারিদের আয় বৃদ্ধি, মাংস ও দুধ উৎপাদন বাড়ানো, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং ভোক্তাদের ন্যায্যমূল্যে মানসম্মত প্রাণিজ খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য।





