মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর মগবাজারের আল-ফালাহ মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে 'বিএনপি সরকারের ৬ মাসের মূল্যায়ন' শীর্ষক বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এসব কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের নির্বাহী পরিষদের সদস্য অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি, রফিকুল ইসলাম খান এমপি, হামিদুর রহমান আজাদসহ শীর্ষ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপির নেতৃত্বে নতুন সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাস পর এখন প্রতিশ্রুতির ভাষায় নয়, বাস্তব ফলাফল, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং জনগণের প্রতি জবাবদিহির মানদণ্ডে সরকারের কার্যক্রম মূল্যায়নের সময় এসেছে।
তার দাবি, সরকারের প্রথম ছয় মাসে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সময়ক্ষেপণ, নীতিগত দ্বিধা, সিদ্ধান্তহীনতা এবং বাস্তব ফলাফলের ঘাটতি স্পষ্ট হয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটে জুলাই জাতীয় সনদভিত্তিক সাংবিধানিক সংস্কারের পক্ষে জনগণ স্পষ্ট রায় দিয়েছে—যেখানে 'হ্যাঁ' ভোট পড়েছে ৪ কোটি ৭২ লাখ ২৫ হাজার ৯৮০টি এবং 'না' ভোট ২ কোটি ১৯ লাখ ৬০ হাজার ২৩১টি। অর্থাৎ 'হ্যাঁ' ভোটের ব্যবধান আড়াই কোটিরও বেশি।
তিনি বলেন, 'হ্যাঁ' জয়ী হলে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কথা ছিল, কিন্তু সংসদ সদস্যরা শপথ নিলেও সংস্কার পরিষদের কাঠামো কার্যকর হয়নি। সরকার পরবর্তী সময়ে সংসদের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের বিকল্প পদ্ধতির দিকে এগিয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
জুলাই সনদের ৩০টি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির নেতৃত্ব, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মৌলিক অধিকার এবং শক্তিশালী স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠার মতো বিষয়গুলো থাকলেও গত ছয় মাসে এগুলোর কোনো একটিরও বাস্তবায়ন দেখা যায়নি।
জ্বালানি সংকট নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন তিনি। দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট, বিপরীতে সরবরাহ ২ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট—প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট কাঠামোগত ঘাটতি রয়েছে। এর প্রভাবে শিল্পকারখানায় প্রায় ৪০ শতাংশ কম উৎপাদন হচ্ছে, প্রায় ২০টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে এবং ২০ হাজার শ্রমিক ছাঁটাইয়ের শিকার হয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন।
সরকারি প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনে দলীয়করণের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয় ও গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগের অভিযোগ জোরালো হয়েছে এবং ১১টি সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার শীর্ষ পদে বিএনপি নেতাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও সমালোচনা করেন তিনি। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের প্রথম ১০০ দিনের মূল্যায়নের তথ্য তুলে ধরে তিনি মার্চ-এপ্রিল সময়ে ৬০৫টি হত্যা, ২৯৪টি ছিনতাই, ১৯৬টি অপহরণ এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের ৩ হাজার ৪৯৬টি ঘটনার কথা উল্লেখ করেন। পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ-মে ২০২৬ সময়ে ৯১৫টি হত্যা মামলা নিবন্ধিত হয়েছে, যেখানে পুরো ২০২৫ সালে এই সংখ্যা ছিল ৭৬৭টি।
দ্রব্যমূল্য নিয়েও সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে জুন ২০২৬-এ সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.১৬ শতাংশ, যা আগের বছরের জুনে ছিল ৮.৪৮ শতাংশ। মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমলেও সামগ্রিক মূল্যস্তর এখনো বেশি—যার ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর খাদ্য, বাসাভাড়া, পরিবহন ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের চাপ বাড়ছে।
ব্যাংকিং খাত নিয়েও তিনি সরকারকে ব্যর্থ বলে মন্তব্য করেন। মার্চ শেষে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২.২৬ শতাংশ—তিন মাসেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা।
পররাষ্ট্রনীতিতেও কৌশলগত দুর্বলতা রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। 'বাংলাদেশ ফার্স্ট'কে মূল দর্শন ঘোষণা করলেও ছয় মাসে এটিকে সুস্পষ্ট ও সমন্বিত পররাষ্ট্রনীতি কাঠামোতে রূপ দেওয়া সম্ভব হয়নি এবং শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণসহ অমীমাংসিত বিষয়েও দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সংবাদ সমেল্লোকে জামায়াতে ইসলামী সরকারের প্রতি আট দফা আহ্বান জানায়। এর মধ্যে রয়েছে—গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সময়বদ্ধ রোডম্যাপ প্রকাশ, গ্যাস ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত জ্বালানি নিরাপত্তা কৌশল প্রণয়ন, প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি নিশ্চিত করা, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনসহ পূর্ণাঙ্গ পররাষ্ট্রনীতি কাঠামো প্রকাশ, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনা এবং খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারে পদক্ষেপ নেওয়া।
বক্তব্যের শেষে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বিএনপি সরকার প্রথম ছয় মাসে জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো শক্তিশালী অর্জন জাতির সামনে তুলে ধরতে পারেনি। জনগণ সরকারকে সমস্যার ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য নয়, সমাধান দেওয়ার জন্য দায়িত্ব দিয়েছে। আগামী সময়ে সরকার যদি ব্যর্থতা ও সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখাতে না পারে, তাহলে জনগণের হতাশা ও আস্থার সংকট আরও গভীর হবে।





