সর্বশেষ

কূটনীতির নতুন সম্ভাবনা

কূটনীতির নতুন সম্ভাবনা
সরদার ফরিদ আহমদ:

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফরকে শুধু দু’টি দেশ সফর হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি ছিল বাংলাদেশের নতুন পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা।

গুরুত্বপূর্ণ দুই অংশীদার দেশের সাথে সম্পর্ককে নতুন গতি দেয়ার একটি প্রয়াস।

এই সফরে বাংলাদেশ কেবল প্রতিশ্রুতি নয়, ভবিষ্যৎ সহযোগিতার একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা পেয়েছে। কূটনীতির ভাষায় সব অর্জন তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান হয় না। অনেক সময় একটি সফল বৈঠক, একটি যৌথ ঘোষণা কিংবা একটি সমঝোতা স্মারকই ভবিষ্যতের বড় অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি করে। প্রধানমন্ত্রীর এই সফর সেই দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

মালয়েশিয়া দীর্ঘদিন ধরে স্থবির থাকা বাংলাদেশী কর্মী নিয়োগ আবার চালুর বিষয়ে আশ্বাস স্বস্তির খবর। শুধু নতুন কর্মী নিয়োগই নয়, অনিয়মিত বাংলাদেশী কর্মীদের বৈধকরণ, আটকে থাকা কর্মীদের কাজে যোগদানের সুযোগ এবং নিয়োগ ব্যয় কমানোর বিষয়েও দুই দেশের মধ্যে ঐকমত্য হয়েছে। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবার সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা নিঃসন্দেহে বড় অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করবে।

মালয়েশিয়ার সাথে মুক্তবাণিজ্য চুক্তির আলোচনা শুরু করার সিদ্ধান্তও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পথে। আগামী দিনের প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ববাজারে টিকে থাকতে নতুন বাজার এবং অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্যসুবিধা প্রয়োজন। এফটিএ সেই লক্ষ্য অর্জনের একটি কার্যকর পথ হতে পারে।

ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর, হালাল শিল্প, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং উচ্চশিক্ষায় সহযোগিতার বিষয়গুলোও দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম সফল অর্থনীতি হিসেবে মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের শিল্পায়ন ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তাৎপর্যপূর্ণ চীন সফর
বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক এখন শুধু উন্নয়ন সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারত্বে রূপ নিচ্ছে। এই পরিবর্তন ভবিষ্যতে বিনিয়োগ, বাণিজ্য, অবকাঠামো এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতাকে আরো শক্তিশালী করবে।

বিশেষ গুরুত্ব বহন করে কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা খাতে ‘টু প্লাস টু’ সংলাপ চালুর সিদ্ধান্ত। এটি দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত উচ্চপর্যায়ের কৌশলগত সংলাপের একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করবে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এ ধরনের ব্যবস্থা পারস্পরিক আস্থা বাড়ায় এবং দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতাকে সুসংহত করে।

তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা দ্রুত সম্পন্ন এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে চীন। পাশাপাশি সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা, নদী খনন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তিগত সহযোগিতার ক্ষেত্রও প্রসারিত হয়েছে। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার সাথে এই উদ্যোগ সরাসরি সম্পর্কিত।

চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর আধুনিকায়নে চীনের আগ্রহও ইতিবাচক। একটি রফতানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য আধুনিক বন্দর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বন্দর সক্ষমতা বাড়লে আমদানি-রফতানি সহজ হবে, পরিবহন ব্যয় কমবে এবং বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরো বৃদ্ধি পাবে। বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন সংযোগ ভবিষ্যতে আঞ্চলিক বাণিজ্যের নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।

বাংলাদেশে চীনের শিল্প স্থানান্তর, নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল, উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়ে যে আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে, তা দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে। বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ করাই হবে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার অন্যতম প্রধান উপায়।

সফরে রোহিঙ্গা সঙ্কটও গুরুত্ব পেয়েছে। মালয়েশিয়া আসিয়ানের মাধ্যমে সক্রিয় ভূমিকা পালনের আশ্বাস দিয়েছে। চীনও এই সঙ্কটের সমাধানে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। দীর্ঘমেয়াদি এই সঙ্কট সমাধানে আন্তর্জাতিক সমর্থন ধরে রাখা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্রিকস, সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা (এসসিও), আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব (আরসিইপি) এবং আসিয়ানের সাথে সম্পৃক্ততা বাড়ানোর ক্ষেত্রে চীন ও মালয়েশিয়ার ইতিবাচক অবস্থান বাংলাদেশের কূটনৈতিক পরিসর আরো বিস্তৃত করবে।

চীনের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অংশগ্রহণ এবং জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ পাওয়া আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি আরো উজ্জ্বল করেছে। জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা এখন বৈশ্বিক নীতিনির্ধারণেও গুরুত্ব পাচ্ছে।

সমঝোতা স্মারককে প্রকল্পে, প্রকল্পকে বিনিয়োগে এবং বিনিয়োগকে কর্মসংস্থানে রূপান্তর করতে পারলেই এই সফরের পূর্ণ সুফল মিলবে। বাংলাদেশ এখন এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যখন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা, নতুন বাজার সৃষ্টি, বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং আঞ্চলিক সংযোগ সম্প্রসারণ একসাথে এগিয়ে নেয়া প্রয়োজন। মালয়েশিয়া ও চীন সফরে সেই চারটি ক্ষেত্রেই ইতিবাচক অগ্রগতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

এই সফরের সবচেয়ে বড় সাফল্য বাংলাদেশ নতুন এক কূটনৈতিক পরিসরে দাঁড়িয়েছে। এখন প্রয়োজন ধারাবাহিক উদ্যোগ, দক্ষ বাস্তবায়ন এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এই সুযোগগুলোকে বাস্তব অর্জনে পরিণত করা। কূটনীতিতে প্রতিটি সফল সফর ভবিষ্যতের জন্য একটি নতুন দরজা খুলে দেয়। তেমনই একটি নতুন দরজা খুলে দিয়েছে এই সফর।

লেখক : সাবেক সাধারণ সম্পাদক ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন

ঢাকা ম্যাগাজিনের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন
মতামত থেকে আরও
যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে সহযোগিতা বাড়াতে সম্মত বাংলাদেশ-জাইকা

যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে সহযোগিতা বাড়াতে সম্মত বাংলাদেশ-জাইকা

৯ ঘণ্টা আগে
৪০ ডিগ্রি ছুঁইছুঁই তাপমাত্রায় হাঁসফাঁস জার্মানি, ভাঙতে পারে ২০১৯ সালের রেকর্ড

৪০ ডিগ্রি ছুঁইছুঁই তাপমাত্রায় হাঁসফাঁস জার্মানি, ভাঙতে পারে ২০১৯ সালের রেকর্ড

১০ ঘণ্টা আগে
পরিমাণ-ওজনে কম দেওয়া বড় গুনাহ

পরিমাণ-ওজনে কম দেওয়া বড় গুনাহ

১০ ঘণ্টা আগে
জীবন-জীবিকার মানোন্নয়নে প্রচেষ্টা প্রশংসনীয়

জীবন-জীবিকার মানোন্নয়নে প্রচেষ্টা প্রশংসনীয়

১০ ঘণ্টা আগে
সব কাজে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টিলাভের আগ্রহ

সব কাজে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টিলাভের আগ্রহ

১০ ঘণ্টা আগে
যেসব আমলে দ্রুত কবুল হতে পারে দোয়া

যেসব আমলে দ্রুত কবুল হতে পারে দোয়া

১০ ঘণ্টা আগে