সবচেয়ে বেদনাদায়ক ঘটনা আলিফ চৌধুরীর ওপর হামলা। উচ্চমাধ্যমিকের একজন শিক্ষার্থী। জাতীয় ছাত্রশক্তির স্থানীয় নেতা। হামলায় তিনি একটি চোখ স্থায়ীভাবে হারিয়েছেন। চিকিৎসকদের ভাষায়, অন্য চোখও ঝুঁকির মধ্যে। পরিবারের আর্থিক অবস্থাও অত্যন্ত দুর্বল। যে পড়াশোনার পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সিং করে পুরো পরিবার চালাত, আজ সে হয়তো সারা জীবনের জন্য অন্ধত্বের অভিশাপ বয়ে বেড়াবে। এটি কেবল একজন তরুণের ট্র্যাজেডি নয়। এটি রাষ্ট্রের ব্যর্থতা।
প্রশ্ন হলো, এই ঘটনার পর রাষ্ট্র কোথায়? সরকারের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো শক্ত অবস্থান দেখা যায়নি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কোনো দৃশ্যমান ভূমিকা নেই। তিনি আছেন কি নেই, সেটিই বোঝা যাচ্ছে না। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের ওপর ধারাবাহিক হামলা হবে, একজন তরুণ চোখ হারাবে, অথচ সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে কোনো কঠোর বার্তা আসবে না– এটি স্বাভাবিক হতে পারে না। নীরবতা কখনো কখনো সমর্থনের ভাষা হয়ে দাঁড়ায়। ইতিহাস তাই বলে।
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেছেন, সরকার জনগণের বিরোধিতা করছে। তিনি বলেছেন, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধির কারণে জনগণের ক্ষোভ বাড়ছে। তার দাবি, এ অবস্থায় সরকারবিরোধী কণ্ঠ দমনের পথ বেছে নিয়েছে।
জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি স্পষ্ট বলেছেন, এক ফ্যাসিবাদ বিদায় হওয়ার পর আরেক ফ্যাসিবাদ জাতি মেনে নেবে না। কারও বক্তব্য অপছন্দ হলে বক্তব্য দিয়ে জবাব দিতে হবে; রড দিয়ে নয়। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কারও নেই।
এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেনের বক্তব্য আরও তাৎপর্যপূর্ণ। তার অভিযোগ, বিরোধী দলের ওপর হামলা করে এমন এক ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে, যা গণতন্ত্রের জন্য হুমকি। তিনি তিন দফা দাবি তুলেছেন– আলিফের চিকিৎসার দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে, হামলাকারীদের গ্রেপ্তার করতে হবে এবং বিরোধী দলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন, হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ায় মনে হচ্ছে, তারা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রশ্রয় পাচ্ছে।
অভিযোগ সত্য না মিথ্যা, সেটি তদন্তের বিষয়। কিন্তু এমন অভিযোগ ওঠার মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়াটাই রাষ্ট্রের জন্য লজ্জার।
আরও উদ্বেগজনক হলো পাল্টা মামলার রাজনীতি। হামলার শিকার হওয়ার পরও এনসিপির শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টা, ভাঙচুর ও ছিনতাইয়ের মামলা হয়েছে। নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও সারজিস আলম সেই মামলাকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অংশ বলে দাবি করেছেন।
এখানে একটি বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন সামনে আসে। বিএনপি কেন এমন করছে? এক সময় বিএনপি নিজেই ছিল ফ্যাসিস্ট হাসিনার নির্যাতনের শিকার। দীর্ঘ দেড় দশক তারা মামলা, হামলা, গুম, গ্রেফতার, রাজনৈতিক দমন-পীড়নের অভিযোগ করেছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে তাদের আরও সহনশীল হওয়ার কথা ছিল। বাস্তবে ক্ষমতায় এসেই তারা বিরোধীদের প্রতিপক্ষ নয়; শত্রু হিসেবে দেখতে শুরু করেছে বলে অভিযোগ জোরালো হচ্ছে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বহু আগে থেকেই এই প্রবণতার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। রবার্ট ডাল তার বহুল আলোচিত তত্ত্বে বলেছেন, গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও অংশগ্রহণ। প্রতিদ্বন্দ্বীকে ধ্বংস করার রাজনীতি গণতন্ত্রকে দুর্বল করে। হান্না আরেন্ট সতর্ক করেছিলেন, ক্ষমতার অপব্যবহার শুরু হয় তখনই, যখন বিরোধী কণ্ঠকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। আর স্টিভেন লেভিটস্কি ও ড্যানিয়েল জিবলাট তাদের বিখ্যাত গবেষণায় দেখিয়েছেন, আধুনিক গণতন্ত্র এক দিনে ধ্বংস হয় না। ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে। প্রথমে বিরোধীদের বৈধতা অস্বীকার করা হয়। এরপর রাজনৈতিক সহিংসতা স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। তারপর রাষ্ট্রযন্ত্র দলীয়করণ হয়। শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্র শুধু কাগজে টিকে থাকে।
বাংলাদেশ কি সেই পথে হাঁটছে? প্রশ্নটি আজ আর অমূলক নয়। রাজনৈতিক সহিংসতা নতুন নয়। কিন্তু জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর মানুষ ভেবেছিল, বাংলাদেশ নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে যাবে। প্রতিহিংসার বদলে সহনশীলতা আসবে। ভিন্নমতের প্রতি সম্মান বাড়বে। বাস্তবতা সেই আশাকে দুর্বল করছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় সরকারের নীরবতা। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার শুধু নিজের দলের সরকার নয়। বিরোধী দলের নিরাপত্তার দায়িত্বও সরকারের। সরকার যদি হামলার ঘটনায় দ্রুত ব্যবস্থা না নেয়, অপরাধীদের বিচারের আওতায় না আনে, তাহলে অপরাধীরা উৎসাহিত হয়। আইন তখন দুর্বল হয়ে পড়ে।
এখানে বিএনপিরও আত্মসমালোচনার সুযোগ রয়েছে। ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা এটিই। আজ যারা ক্ষমতায়, কাল তারা বিরোধী দলে যেতে পারেন। তাই যে সংস্কৃতি তারা প্রতিষ্ঠা করবেন, ভবিষ্যতে সেই সংস্কৃতির শিকার তারাই হতে পারেন।
গণতন্ত্র প্রতিশোধের নাম নয়। গণতন্ত্র সহাবস্থানের নাম। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার রাজনীতি শেষ পর্যন্ত কাউকেই নিরাপত্তা দেয় না। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম অঙ্গীকার ছিল– আর কোনো ফ্যাসিবাদ নয়। আর কোনো রাজনৈতিক দমন নয়। আর কোনো রক্তাক্ত প্রতিশোধ নয়। সেই অঙ্গীকার যদি ভেঙে যায়, তাহলে জুলাইয়ের আত্মত্যাগও প্রশ্নের মুখে পড়বে।
সরকারের উচিত অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্তের ব্যবস্থা করা। আলিফ চৌধুরীর ওপর হামলাসহ সব ঘটনায় দোষীদের আইনের আওতায় আনা। বিরোধী দলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের কাছে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া– আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। কারণ গণতন্ত্রে বিরোধী দল দুর্বল হলে সরকারও শেষ পর্যন্ত শক্তিশালী থাকে না। গণতন্ত্র টিকে থাকে শক্তিশালী বিরোধী দল, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগের ওপর।
আজকের বাংলাদেশ সেই পরীক্ষার মুখোমুখি। এতে ব্যর্থ হলে ক্ষতি শুধু একটি দলের হবে না। ক্ষতি হবে পুরো রাষ্ট্রের।
লেখক : সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন