বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই মাসে দেশে এসেছিল ২৪৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার। সেই হিসাবে এক বছরে অতিরিক্ত এসেছে ৩৮ কোটি ১০ লাখ ডলার। মাসের শেষ দুই দিনেই (৩০ ও ৩১ জুলাই) এসেছে ১৫ কোটি ২০ লাখ ডলার।
বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী (প্রতি ডলার ১২৩ টাকা) জুলাই মাসে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন প্রায় ৩৫ হাজার ১৬৬ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময়ে এ অঙ্ক ছিল প্রায় ৩০ হাজার ৪৬৯ কোটি টাকা। ফলে এক বছরে অতিরিক্ত এসেছে প্রায় ৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।
ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠাতে সরকারি প্রণোদনা, ব্যাংকগুলোর ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ, বিদেশে এক্সচেঞ্জ হাউসের নেটওয়ার্ক বৃদ্ধি এবং হুন্ডির বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারির কারণে প্রবাসীরা এখন বেশি করে আনুষ্ঠানিক পথে অর্থ পাঠাচ্ছেন। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে রেমিট্যান্স প্রবাহে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, রেমিট্যান্সের এই প্রবৃদ্ধি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করার পাশাপাশি ডলারের সরবরাহ বাড়িয়ে বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে আমদানি বিল পরিশোধ এবং বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর চাপও কিছুটা কমবে।
বেসরকারি ব্যাংকের দখলে রেমিট্যান্স বাজার
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসে মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৭৩ শতাংশ বা ২০৮ কোটি ৯৮ লাখ ডলার এসেছে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসেছে ৪৩ কোটি ৭৯ লাখ ডলার, যা মোট প্রবাহের প্রায় ১৫ শতাংশ। বিশেষায়িত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক একাই সংগ্রহ করেছে ৩২ কোটি ৫৫ লাখ ডলার, যা মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ১১ শতাংশ। অন্যদিকে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসেছে মাত্র ৫৩ লাখ ডলার।
বিশ্লেষকদের মতে, বিস্তৃত এক্সচেঞ্জ হাউস নেটওয়ার্ক, দ্রুত অর্থ বিতরণ ব্যবস্থা, মোবাইল ব্যাংকিং সংযোগ এবং প্রবাসীদের আস্থার কারণে বেসরকারি ব্যাংকগুলো ধারাবাহিকভাবে রেমিট্যান্স বাজারে আধিপত্য ধরে রেখেছে।
ইসলামী ব্যাংক শীর্ষে
একক ব্যাংক হিসেবে জুলাই মাসেও সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স সংগ্রহ করেছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি। ব্যাংকটির মাধ্যমে এসেছে ৪৫ কোটি ২২ লাখ ডলার, যা মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ১৬ শতাংশ। অর্থাৎ দেশে আসা প্রতি ছয় ডলারের প্রায় এক ডলারই এসেছে এই ব্যাংকের মাধ্যমে।
দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, যার মাধ্যমে এসেছে ৩২ কোটি ৫৫ লাখ ডলার। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক, যার মাধ্যমে এসেছে ২৭ কোটি ডলার।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স সংগ্রহ করেছে অগ্রণী ব্যাংক। ব্যাংকটির মাধ্যমে এসেছে ২৪ কোটি ৫৭ লাখ ডলার, যা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মোট রেমিট্যান্সের অর্ধেকেরও বেশি।
এ ছাড়া সিটি ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, ডাচ-বাংলা ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক এবং ট্রাস্ট ব্যাংক—প্রতিটি ১০ কোটি ডলারের বেশি রেমিট্যান্স সংগ্রহ করেছে।
৭ ব্যাংকে শূন্য রেমিট্যান্স
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসে সাতটি ব্যাংক কোনো রেমিট্যান্স সংগ্রহ করতে পারেনি। সংশ্লিষ্টদের মতে, দুর্বল আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক, সীমিত প্রবাসী গ্রাহক এবং পর্যাপ্ত এক্সচেঞ্জ হাউস না থাকায় এসব ব্যাংক রেমিট্যান্স বাজারে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না।
এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে রপ্তানি আয়ও ইতিবাচক ধারায় রয়েছে। রপ্তানি আয়ের পাশাপাশি রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়তে থাকায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে ডলারের বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং আমদানি ব্যয় নির্বিঘ্নে মেটানোর ক্ষেত্রেও এই প্রবাহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।