জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত শুক্রবার পর্যন্ত চট্টগ্রামের ১৭৬টি ইউনিয়নের ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৮টি পরিবারের মোট ৭ লাখ ৫৪ হাজার ৫৯০ জন মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। গত রোববার থেকে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ ও বাঁশখালীর বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত সাতকানিয়া উপজেলা। এখানকার প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা এখনও পানির নিচে রয়েছে এবং চার লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় আছেন। অধিকাংশ অভ্যন্তরীণ সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, উপজেলা পরিষদ, থানা, আদালত ও পৌরসভা কার্যালয়েও এখনো পানি জমে রয়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকায় বিস্তীর্ণ এলাকা অন্ধকারে রয়েছে। পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানির সংকট ও ঘরে পানি থাকায় রান্না করতে না পেরে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন বাসিন্দারা।
বাঁশখালীর ছনুয়া, পুঁইছড়ি, শেখেরখীল, সরল ও কাহারঘোনাসহ পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায়ও পানি পুরোপুরি নামেনি। পাহাড়ি ঢল ও সাগরের জোয়ারে বহু বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক এলাকায় এখনো বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। উপজেলা প্রশাসন প্রায় চার হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার ও দেড় হাজার প্যাকেট রান্না করা খাবার বিতরণ করেছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনও ত্রাণ সহায়তা দিচ্ছে। তবে ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ, প্রয়োজনের তুলনায় এসব সহায়তা অপ্রতুল।
চন্দনাইশের দুই পৌরসভা ও আটটি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলেও বন্যার পানি এখনো পুরোপুরি নামেনি। প্রায় ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। বন্যায় প্রায় ২ হাজার ২০০ হেক্টর আউশ ধান, ৯০০ হেক্টর সবজি এবং ৭০ হেক্টর পেঁপে ক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া পাঁচ শতাধিক পুকুর ও মাছের প্রজেক্ট তলিয়ে গিয়ে অন্তত ১০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিভিন্ন সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা এখনও স্বাভাবিক হয়নি।
দুর্গত এলাকার বাসিন্দারা জানান, পানি কিছুটা কমলেও বাস্তব পরিস্থিতির তেমন পরিবর্তন হয়নি। বিদ্যুৎ না থাকায় রাত কাটানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশুদ্ধ পানির সংকট এবং খাদ্য সংগ্রহের সমস্যায় ভোগান্তি আরও বেড়েছে।
সাতকানিয়ার চরতি ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. নুরুল ইসলাম বলেন, চার দিন ধরে ঘরে পানি। রান্না করতে পারছি না। শুকনো খাবারও শেষ হয়ে গেছে। বিদ্যুৎ না থাকায় শিশুদের নিয়ে খুব কষ্টে থাকতে হচ্ছে।
বাঁশখালীর ছনুয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা বেলাল উদ্দিন বলেন, ঘরে এখনো পানি। চুলা জ্বালানোর কোনো সুযোগ নেই। ছোট ছোট সন্তানদের নিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছি। বিশুদ্ধ পানিও পাওয়া যাচ্ছে না, এখনো সরকারি কোনো সহায়তা পাইনি।
চন্দনাইশের বাসিন্দা আবদুল কাদের জানান, ফসল ও মাছের ঘেরের ব্যাপক ক্ষতির কারণে অনেক পরিবার আর্থিক সংকটে পড়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে দ্রুত ত্রাণ, শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দিতে জেলা প্রশাসন কাজ করছে। যেসব এলাকায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, সেখানে বিকল্প উপায়ে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিল্টন বিশ্বাস বলেন, পানি কিছুটা কমলেও অনেক মানুষ এখনও পানিবন্দি। আশ্রয়কেন্দ্র ও দুর্গত এলাকায় নিয়মিত ত্রাণ বিতরণ চলছে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত প্রশাসনের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।