সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, সোহেল বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলনের প্রথমে পিএস, তারপর মাউশির ডিজি হওয়ার পর থেকেই নানা বিতর্কে জড়ান।
তার বিরুদ্ধে টাকার বিনিময়ে নিয়মবহির্ভূত বদলি পদায়নের গুরুতর অভিযোগ ওঠে। সর্বশেষ শিক্ষা প্রশাসনে থাকা বগুড়ার একটি প্রভাবশীল গ্রুপের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে বেকায়দায় পড়ে যান তিনি এমন পরিস্থিতি সামাল দিতেই নতুন ডিজি নিয়োগের সিদ্ধান্তে যাচ্ছে সরকার। এজন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে পাঁচ সদস্যের একটি সার্চ কমিটি গঠন করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, গত জুনের শেষদিকে গঠন করা পাঁচ সদস্যের সার্চ কমিটিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দুজন অতিরিক্ত সচিব এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দুজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছিলেন। শিক্ষা প্রশাসনে তুলনামূলক সৎ ও যোগ্য কর্মকর্তাদের নাম খুঁজতে গঠিত এই কমিটি তিনজনের নাম চূড়ান্ত করে পাঠিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে। প্রস্তাবিত তালিকায় রয়েছেন বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মাহফুজুল ইসলাম, মাউশির (পরিচালক-কলেয়া ও প্রশাসন) অধ্যাপক নাজমুল হক ও কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের সচিব অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম। তাদের মধ্যে মাহফুজুল ইসলামের ফিজি হওয়ার বিষয়ে জোর গুঞ্জন রয়েছে। দ্বিতীয় পছন্দ হিসেবে নাজমুল হকের নাম থাকলেও তিনি বর্তমান ডিজি সোহেলের বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের হলমেট ও ব্যাচমেট হওয়ায় তার পাল্লা কিছুটা হালকা। এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি মাহফুজুল ইসলাম। তিনি আগামীর সময়ের সঙ্গে আলাপকালে জানিয়েছেন, তিনি আজিজুল হক কলেজের মানোন্নয়নের জন্য কাজ করছেন।
গত সপ্তাহ নিজ দপ্তরে শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন আগামীর সময়কে বলেছিলেন, 'নতুন ডিজির নিয়োগে সার্চ কমিটি গঠন বা নতুন ডিজির বিষয়াটি আমার জানা নেই।' আর মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক আগামীর সময়কে বলেছেন, 'ডিজি নিয়োগ হয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে। বিষয়টি নিয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে চইন।'
যেভাবে বগুড়া গ্রুপের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়ান। ঘটনার সূত্রপাত সম্প্রতি মাউশি অধিদপ্তরের কলেজ শাখার একজন সহকারী পরিচালকের পদায়ন ঘিরে। একজন প্রতিমন্ত্রী ও বগুড়ার প্রভাবশীল একটি গ্রুপের সুপারিশে কলেজ শাখায় একজন পদায়ন
পান। ওই কর্মকর্তার পদায়নের পর তার বিরুদ্ধে আওয়ামীপন্থী একটি প্যানেল থেকে শিক্ষা কয়ভার সমিতির নির্বাচন করা ও শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে একটি লেখা সামনে আসে। এ ইস্যুকে কেন্দ্র করে ডিজি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে তাকে যোগদান কক্স থেকে বিরত রাখেন। পরে ওই কর্মকর্তা বগুড়ার এক সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রীর মাধ্যমে ডিজিকে চাপ দিয়ে যোগদান করেন। এ নিয়ে ডিজির রুমে বগুড়াবলয়ের চার কর্মকর্তার সঙ্গে সোহেলের বাগবিতণ্ডা হয়। তখন থেকেই মূলত ডিজি সোহেলকে সরাতে একাট্টা হয় বগুড়া গ্রুপটি। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি প্রভাবশালী গ্রুপ এবং মাউশিতে কর্মরত সহকারী পরিচালক পদের এক কর্মকর্তার শ্বশুর, যিনি বগুড়ার এমপি।
প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মতে, মাউশির ডিজি পদটি ঐতিহাসিকভাবেই প্রশাসনিক ভারসাম্যের একটি বড় জায়গা। সরকার সচরাচর শিক্ষামন্ত্রীর পছন্দের বাইরে অন্য কোনো রাজনৈতিক বা প্রশাসনিকবলয়ের কাউকে এ পদে বসাত। ২০০৯-১৮ মেয়াদে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের সময়ে প্রথমে ডিজি ছিলেন প্রফেসর নোমান-উর-রশীদ। পরে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলামের বোন অধ্যাপক ফাহিমা খাতুন এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেয়াই ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেনের আস্থাভাজন অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান ডিজি হন। ২০১৯-২৪ মেয়াদে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ড. দীপু মনি ও মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের সময়ে ডিজির দায়িত্বে আসেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের ভাগে অধ্যাপক নেহাল আহমেদসহ আরও কয়েকজন। যারা সবাই ছিলেন তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রীর পছন্দের বাইরের। এসব মেয়াদে মন্ত্রী ও মাউশি ডিজির মেরু আলাদা থাকায় ক্ষমতার একটি স্বাভাবিক ভারসাম্য ছিল বলে দাবি কর্মকর্তাদের।
কিন্তু বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলনের ২০০১-০৬ মেয়াদের পিএস এবং দীর্ঘদিনের আস্থাভাজন ড. সোহেলকে এককভাবে দায়িত্ব দেওয়ায় সে ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে। তাদের দাবি, এতে ডিজি ও মন্ত্রীর দপ্তর এক হয়ে একক আধিপত্য সৃষ্টি হয়, যা নতুন সরকারের ভাবমূর্তির ওপর প্রভাব ফেলছে।