ভারতের একটি বড় প্রত্যাশা ছিল, বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত নেতৃত্ব হয়তো দ্রুত দেশে ফিরে রাজনৈতিক অবস্থান পুনরুদ্ধার করতে পারবে। সেই প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় দিল্লির কূটনৈতিক হিসাবও জটিল হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের জনগণের রাজনৈতিক অবস্থান, নতুন নেতৃত্বের উত্থান এবং পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে উপেক্ষা করে পুরোনো বাস্তবতায় ফিরে যাওয়ার চেষ্টা কতটা কার্যকর হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতেও এর প্রভাব পড়ছে। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ক নতুন করে বিস্তৃত হচ্ছে। চীন, পাকিস্তান, তুরস্ক, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়ার ফলে ভারতের একক প্রভাব ধরে রাখার সুযোগও আগের তুলনায় সীমিত হয়েছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের জনগণের কাছে জুলাইয়ের আন্দোলন ও পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তন একটি নতুন বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে। আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত তরুণ প্রজন্মের মধ্যে জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব এবং পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্যের প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে বাংলাদেশের জনগণের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে পাশ কাটিয়ে কোনো পুরোনো রাজনৈতিক সমীকরণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা সহজ হবে না।
ভারতের গণমাধ্যমের একটি অংশ এবং বিভিন্ন প্রচারমাধ্যম বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পরিবর্তনকে নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছে। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার এবং বিকল্প তথ্যপ্রবাহের কারণে একমুখী প্রচারণার প্রভাব আগের মতো নেই। বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম এখন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উৎস থেকে তথ্য গ্রহণ করছে এবং নিজস্ব রাজনৈতিক মূল্যায়ন তৈরি করছে।
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরও কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
প্রথমত, অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিকল্প বাজার ও সরবরাহব্যবস্থা তৈরির প্রবণতা বাড়ছে। অতীতে যেসব পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে ভারতের ওপর নির্ভরশীলতা ছিল বেশি, সেসব ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ ধীরে ধীরে অন্যান্য উৎসের দিকে তাকাচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, দুই দেশের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সহযোগিতার পুরোনো কাঠামো কতটা কার্যকর থাকবে, তা নিয়েও নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।
তৃতীয়ত, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর নিরাপত্তা ও যোগাযোগব্যবস্থার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভূকৌশলগত গুরুত্ব আগের মতোই রয়েছে। ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে স্থিতিশীল ও পারস্পরিক সম্মানভিত্তিক সম্পর্ক ভারতের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
চতুর্থত, বাংলাদেশের বাজার হারানোর আশঙ্কা ভারতের জন্য অর্থনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় ১৭ কোটি মানুষের এই বাজারে ভারতের ব্যবসায়িক স্বার্থ ব্যাপক। তাই রাজনৈতিক টানাপোড়েন দীর্ঘস্থায়ী হলে তার অর্থনৈতিক প্রভাব দুই দেশকেই বহন করতে হবে।
পঞ্চমত, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সহযোগিতা ভারতের কৌশলগত হিসাবকে আরও জটিল করছে। তিস্তা প্রকল্প, নদী ব্যবস্থাপনা, যোগাযোগ অবকাঠামোসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যদি বহুমুখী অংশীদারিত্ব গড়ে তোলে, তাহলে একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার সুযোগ কমে যাবে।
এখানে মিয়ানমারের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের সম্পর্ক নানা জটিলতার মধ্য দিয়ে গেলেও আঞ্চলিক বাস্তবতায় দেশটির সঙ্গে যোগাযোগ ও স্বার্থের সমীকরণও পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের ওপর একক কোনো শক্তির প্রভাব প্রতিষ্ঠা করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঘিরে ভারতের অবস্থানও দুই দেশের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে এটি শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক নয়, আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই নির্ধারিত হওয়া উচিত। প্রত্যর্পণ চুক্তি, বিচারিক সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর অবস্থান ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নির্ধারণ করবে। বাংলাদেশের জনগণের প্রত্যাশা হলো, যেকোনো অভিযোগ ও বিচারিক বিষয় যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি হোক।
ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সম্ভবত এখানেই। বাংলাদেশ এখন আর আগের অবস্থানে নেই। রাজনৈতিকভাবে সচেতন একটি নতুন প্রজন্ম তৈরি হয়েছে, যারা পররাষ্ট্রনীতিতে কোনো দেশের একক প্রভাব মেনে নিতে আগ্রহী নয়। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক টেকসই করতে হলে তাই পুরোনো প্রভাব বিস্তারের কৌশলের পরিবর্তে সমতা, পারস্পরিক স্বার্থ এবং সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মানকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
বাংলাদেশের জনগণের ভারতবিরোধিতা বা ভারতপ্রীতি কোনোটিকেই একমাত্রিকভাবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই। দুই দেশের মানুষের মধ্যে ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে বাংলাদেশের জনগণের নিজস্ব প্রত্যাশাও রয়েছে। ভারতীয় সংস্কৃতি বা বাজারের প্রতি আগ্রহ থাকা মানেই ভারতের রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতি সমর্থন নয়।
সবশেষে একটি বিষয় স্পষ্ট। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জনগণই নির্ধারণ করবে। কোনো বিদেশি শক্তির পছন্দ, চাপ কিংবা রাজনৈতিক সমীকরণ দিয়ে বাংলাদেশের জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
ভারতের জন্যও বাস্তবতা মেনে নেওয়ার সময় এসেছে। বাংলাদেশকে প্রভাবিত করার পরিবর্তে বাংলাদেশের সঙ্গে সমমর্যাদার অংশীদারিত্ব গড়ে তোলাই হতে পারে দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের সবচেয়ে কার্যকর পথ। পুরোনো রাজনৈতিক সমীকরণ আঁকড়ে থাকার পরিবর্তে নতুন বাংলাদেশের বাস্তবতাকে স্বীকার করাই হবে অধিক বাস্তবসম্মত কূটনীতি।
কারণ শেষ পর্যন্ত ভূরাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, কোনো দেশের জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে দীর্ঘদিন উপেক্ষা করে টেকসই প্রভাব প্রতিষ্ঠা করা যায় না।




