বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) শাহবাগে বাংলাদেশের চা জনগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে এ কর্মসূচি পালন করা হয়।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, দেশের ১৭০টি চা বাগানে প্রায় ১৫ লাখ চা জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে বসবাস ও শ্রম দিয়ে আসছে। চা শিল্প দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও এই শিল্পের মূল চালিকাশক্তি চা শ্রমিকরা এখনো ন্যায্য মজুরি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন ও ভূমির অধিকার থেকে বঞ্চিত।
তারা বলেন, বর্তমানে একজন চা শ্রমিকের দৈনিক মজুরি মাত্র ১৮৭ টাকা। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সময়ে এই মজুরি দিয়ে শ্রমিকদের জীবনযাপন অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে চা শ্রমিকরা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি মজুরি পান বলেও সমাবেশে উল্লেখ করা হয়।
বক্তারা আরও বলেন, ১৭০টি চা বাগানের মধ্যে অধিকাংশ বাগানে পর্যাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই। অনেক শিশুকে কয়েক কিলোমিটার হেঁটে স্কুলে যেতে হয়। চা বাগানগুলোতে হাসপাতাল, চিকিৎসক, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকট রয়েছে। একই সঙ্গে অধিকাংশ শ্রমিক পরিবার অত্যন্ত ছোট পরিসরের ঘরে বসবাস করায় আবাসন সংকটও প্রকট।
ভূমি অধিকার প্রসঙ্গে বক্তারা বলেন, প্রজন্মের পর প্রজন্ম চা বাগানে বসবাস করলেও শ্রমিকদের বসতভিটার মালিকানা নিশ্চিত করা হয়নি। জমির দলিল না থাকায় তারা ব্যাংকঋণ গ্রহণ, ঘর নির্মাণ এবং ভূমি দখলের বিরুদ্ধে আইনি প্রতিকার পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন।
সমাবেশে শ্রম আইন লঙ্ঘনের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়। বক্তাদের দাবি, আইন অনুযায়ী নিয়োগপত্র দেওয়া এবং তিন মাস কাজের পর স্থায়ী করার বিধান থাকলেও বিপুলসংখ্যক চা শ্রমিক দীর্ঘদিন কাজ করেও স্থায়ী মর্যাদা পাচ্ছেন না।
১১ দফা দাবি
চা শ্রমিকদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—
১. চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি কমপক্ষে ৫০০ টাকা নির্ধারণ।
২. চা জনগোষ্ঠীর ভূমির অধিকার নিশ্চিত করা।
৩. শ্রম আইন অনুযায়ী নিয়োগপত্র প্রদান ও তিন মাস পর স্থায়ীকরণের বিধান কার্যকর করতে বিশেষ মনিটরিং সেল গঠন এবং আইন লঙ্ঘনকারী বাগান মালিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।
৪. প্রতিটি চা বাগানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং চা বাগান এলাকায় উচ্চ বিদ্যালয়, কারিগরি বিদ্যালয় ও কলেজ প্রতিষ্ঠা।
৫. প্রতিটি চা বাগান ক্লাস্টারে পূর্ণাঙ্গ সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন, চিকিৎসক, ধাত্রী, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিশ্চিত করা এবং বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা।
৬. চা শ্রমিকদের জন্য মানসম্মত আবাসন নির্মাণে বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ এবং বিদ্যুৎ, পয়ঃনিষ্কাশন ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করা।
৭. চা বাগানের ১১৬টি জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক স্বীকৃতিসহ তাদের ভাষা, সংস্কৃতি, লোকশিল্প, উৎসব ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে ‘চা জনগোষ্ঠী কালচারাল একাডেমি’ প্রতিষ্ঠা।
৮. জাতীয় বাজেটে চা জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের জন্য পৃথক বরাদ্দ এবং বরাদ্দের অর্থ ব্যবহারে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে স্বাধীন মনিটরিং কমিটি গঠন।
৯. বেকার যুবকদের দক্ষতা উন্নয়ন ও আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিসহ চা শ্রমিকদের সমস্যা সমাধানে ‘চা শ্রমিক উন্নয়ন একাডেমি’ প্রতিষ্ঠা এবং পৃথক মন্ত্রণালয় গঠন।
১০. চা শ্রমিকদের স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক শ্রম আইনের বিভিন্ন ধারা-উপধারা সংশোধন, চা বাগান পরিদর্শন ব্যবস্থা শক্তিশালী এবং শ্রমিকদের জন্য বিশেষ আইনি সহায়তা চালু করা।
১১. জাতীয় গণশুমারিতে চা জনগোষ্ঠীকে পৃথকভাবে গণনা ও স্বীকৃতি দেওয়া, যাতে তাদের প্রকৃত সংখ্যা, অবস্থান ও প্রয়োজন নিরূপণ করে উন্নয়ন পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা যায়।
সমাবেশ থেকে চা শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।




