ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কোনো সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি আমাদের আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত ঝুঁকির একটি বড় উদাহরণ। একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনা ঘটলেই যদি জাতীয় পর্যায়ে গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়, তাহলে বর্তমান অবকাঠামো ও সরবরাহব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।
বর্তমানে দেশের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। এর বিপরীতে সরবরাহ নেমে এসেছে সর্বোচ্চ ২৭০ কোটি ঘনফুটের কাছাকাছি। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় বিপুল ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পর্যাপ্ত জ্বালানি না পেলে উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে গ্যাস–সংকট দীর্ঘায়িত হলে বিদ্যুৎ সরবরাহেও চাপ বাড়তে পারে।
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন আবাসিক গ্রাহকেরা। দিনের বড় একটি সময় গ্যাস না থাকায় অনেক পরিবারকে বিকল্প ব্যবস্থায় রান্না করতে হচ্ছে। কেউ ইনডাকশন চুলা, কেউ বৈদ্যুতিক চুলা কিনছেন। উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে এ ধরনের অতিরিক্ত ব্যয় সাধারণ পরিবারের জন্য নিঃসন্দেহে বড় চাপ। অন্যদিকে সিএনজিনির্ভর যানবাহনের চালকেরা দীর্ঘ সময় পাম্পে অপেক্ষা করেও পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছেন না। এতে তাঁদের কর্মঘণ্টা ও আয় দুটোই কমছে।
শিল্প খাতেও এর প্রভাব উদ্বেগজনক। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় অনেক কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও ডিজেল বা এলপিজির মতো তুলনামূলক ব্যয়বহুল বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, যা শেষ পর্যন্ত পণ্যের দাম ও সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। গ্যাস–সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ—সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে ঝুঁকি এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামের ওঠানামা বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে বেশি ব্যয়ে এলএনজি কিনতে হয়; আবার সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব সরাসরি দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনে এসে পড়ে। ফলে শুধু আমদানি বাড়িয়ে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বিকল্প নেই। দেশের স্থল ও সমুদ্রভাগে নতুন গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করতে হবে। পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়নে বিনিয়োগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য যত বাড়বে, কোনো একটি উৎস বা অবকাঠামোর ওপর নির্ভরতার ঝুঁকি তত কমবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এলএনজি আমদানির পাশাপাশি এর সরবরাহ অবকাঠামোতেও বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করা। বর্তমানে ভাসমান টার্মিনালের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে একটি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটি বা দুর্ঘটনা পুরো সরবরাহব্যবস্থাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। এ অবস্থায় স্থলভাগে একটি আধুনিক ও নিরাপদ এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ সময়ের দাবি। এটি শুধু বর্তমান সংকট মোকাবিলায় সহায়ক হবে না, ভবিষ্যতে সরবরাহব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাকআপ হিসেবেও কাজ করবে।
তবে শুধু নতুন টার্মিনাল নির্মাণ করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। টার্মিনাল, পাইপলাইন, গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থার সক্ষমতা সমন্বিতভাবে বাড়াতে হবে। জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত বিকল্প উৎস থেকে গ্যাস সরবরাহের ব্যবস্থা থাকতে হবে। পাশাপাশি গ্যাসের অপচয় রোধ, সঠিক ব্যবস্থাপনা ও চাহিদা–সরবরাহের বাস্তবসম্মত পরিকল্পনাও নিশ্চিত করা জরুরি।
মহেশখালীর দুর্ঘটনা আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা যখন বাড়ছে, তখন আমদানিনির্ভরতার পাশাপাশি সরবরাহ অবকাঠামোর একক নির্ভরতাও কমাতে হবে। জনগণ ও শিল্পের স্বার্থে জ্বালানি নিরাপত্তাকে শুধু তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলার বিষয় হিসেবে না দেখে জাতীয় অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
আমরা মনে করি, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থলভাগে অন্তত আরও একটি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ দ্রুত নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। কারণ বিপুল অর্থ ব্যয় করে আমদানি করা জ্বালানি যদি একটি দুর্ঘটনা বা কারিগরি ত্রুটির কারণে ভোক্তার কাছে পৌঁছাতেই না পারে, তার চেয়ে বড় অপচয় ও অনিশ্চয়তা আর কী হতে পারে?




