সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অবসরপ্রাপ্ত আমলা মো. সামসুল আলমকে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিনি চাকরি জীবনে নির্বাচন কমিশনের নির্বাচন পরিচালনা শাখায় দায়িত্ব পালন করেন এবং ২০১৭ সালে অবসরে যান। এরপর বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হন।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে এই নিয়োগকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, নির্বাচন কমিশনের প্রশাসনিক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ পদে রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত একজন ব্যক্তির নিয়োগ কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে।
সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, নির্বাচন কমিশনের মতো একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক দিক থেকে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। তার দাবি, এতে আগামী নির্বাচনকে প্রভাবিত করার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি দাবি করেন, স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকারি দলের নির্বাচনী ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ শুরু হয়েছে। তার ভাষ্য, নির্বাচন পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি রাজনৈতিক পরিচয়ের হলে নিরপেক্ষতা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় বলেন, সরকার নিয়োগ দিলে কমিশনের কিছু করার থাকে না।
আগামী অক্টোবর থেকে পর্যায়ক্রমে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে অতিরিক্ত সচিব সচিবের পরেই প্রশাসনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকেন। কমিশনের অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ ফাইল তার মাধ্যমে সচিবের কাছে যায় এবং নীতিনির্ধারণী বৈঠকেও তিনি অংশ নেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নির্বাচন কমিশনের এক কর্মকর্তা বলেন, অতিরিক্ত সচিবের দায়িত্বের পরিধি ব্যাপক। বদলি, প্রশাসনিক কার্যক্রম ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তার সম্পৃক্ততা থাকে। ফলে এই পদে নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে, সামসুল আলম ছাড়াও সম্প্রতি অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদায় আরও কয়েকটি সরকারি সংস্থার শীর্ষ পদে বিএনপির সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর আগে বিভিন্ন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান পদেও বিএনপির নেতাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আবদুল বারী বলেন, এসব নিয়োগ দেওয়ার আইনগত এখতিয়ার সরকারের রয়েছে এবং এ বিষয়ে সরকার কাউকে জবাব দিতে বাধ্য নয়।
প্রশাসন বিশ্লেষকদের মধ্যে এ নিয়োগ নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে। সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আওয়াল মজুমদার মনে করেন, প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও দীর্ঘদিনের অস্থিরতার কারণে সরকার নিজস্ব আস্থাভাজন ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আনছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, নিয়োগপ্রাপ্তরা যদি বিধি-বিধান অনুসরণ না করেন, তাহলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক সাদিক হাসানের মতে, দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকার কারণে প্রশাসন নিয়ে সরকারের মধ্যে অনাস্থা কাজ করছে। সেই প্রেক্ষাপটেই গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে রাজনৈতিকভাবে আস্থাভাজন ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।